পরিণয়ে পরিণতি

পরিণয়ে পরিণতি !! Part- 16

সারার_গল্পকথা ( কাজী সারা)
মুনতাহা সাইমুনের কল দেখে কেটে দিলো। ২-৩ বার কাটার পরেও কল বাজছে। বার বার কল দেয়াতে মুনতাহা কি মনে করে ধরল,,
— কি ব্যাপার সমস্যা কি?? এত কল কিসের??
— মুনতাহা তুমি কোথায়??
— আমি কোথায় সেটা জেনে তোমার লাভ কি?? আমি তোমাদের জীবন থেকে অনেক দূরে চলে আসছি এবার আর কেউ তোমাকে জ্বালাবে না। কেউ বুঝাবে না তোমাকে ভালোবাসে।
— দূরে গেলে কি সম্পর্ক শেষ হয়!!
— সম্পর্কের মানে বুঝলে এটা বলতে না। সম্পর্ক থাকলে তো শেষ হবে তাই না। আমাদের মাঝে কখনো সম্পর্ক ছিলো না যা ছিলো তা কেবল সময়ের প্রয়োজন।
— যাওয়ার আগে আমাকে জানিয়ে পর্যন্ত গেলে না।
— জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি। অই বাসায় আপন বলতে আমার কেউ নেই। কারণ আপন মানুষ রা কষ্টের সময় ছেড়ে যায় না।
— মুনতাহা অনেক বদলে গেছো তুমি।
— সময় মানুষকে বদলে দেয়। তুমিও তো বদলে গিয়েছিলে। আমার ভালোবাসা বিশ্বাস আস্থা কে পায়ের নিছে পিষে সুখি হতে চেয়েছিলে।
একটা কথা কি জানো সাইমুন৷ সবার জীবনে জয় আসে আমার জীবনে ও আসবে সেদিন তুমি হেরে যাবে আমার কাছে।
— আমি তো অনেক আগে হেরে গেছি জীবন যুদ্ধে।
— যে অক্ষমতার জন্য আমাকে ছাড়তে বিন্দু পরিমান মায়া হয়নি সেটাই তোমার উপর খুব ভারি হয়ে পড়বে।
জানো তো কোন মানুষ এ পৃথিবীতে পূর্ণতা নিয়ে জন্ম নেয় না অপূর্ণতা আছে বলে পূর্ণতা পেতে মানুষের এত আয়োজন।
— কি বুঝাতে চাচ্ছ?? কি ভারি হবার কথা বলছ??
— সময় তোমাকে বুঝিয়ে দিবে। আমাকে আর কল দিবে না। এখন রাখি।
— মুনতাহা মুনতাহা… রেখো না।
— কিছু বলবে??
সাইমুন বিড়বিড় করে বলছে
“” আমি ভালো নেই মুনতাহা! তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়।
— ভালো থেকো।
সাইমুনের খুব ইচ্ছে করছে এই বিশাল আকাশে মনের নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিতে।।
আমি জানি মুনতাহা আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি। সেই মুহুর্তে মায়ের কথা চারপাশের পরিস্থিতি সবার কথা আমার কি জানি হয়ে গিয়েছিলো। আজ আমার কিচ্ছু নেই। আমার পক্ষে অবন্তিকা কে ও আপন করে নেয়া সম্ভব না। বাসায় গেলে তোমার স্মৃতি গুলো আমাকে ঝাপটে ধরে। আমি তোমাকে বিরক্ত করব না তুমি সুখে থাকো তোমার জগতে। আমি তোমার যোগ্য না আমি স্বার্থপর।
মানুষ কখন কি করে, কেন করে অনেক সময় নিজে বুঝে না। কিছু বুঝে উঠার আগে চোখের পলকে সব ঘটে যায়৷
যখন ঘটে যায় তখন বুঝে সে কি করেছে।। জীবনের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল সারাজীবন দিলেও শেষ হয় না। তাই সবার উচিত নিজের মনের কথা শুনা আসলে মন কি চায় সেটার খোঁজ করা…
মোবাইল রাখার পর মুনতাহার বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে। ও জানে সাইমুন হয়ত ভালো নেই। কিন্তু স্বার্থপর মানুষদের কষ্ট পাওয়ার দরকার। এখন এত অনুভূতি খারাপ লাগা দিয়ে কি হবে যেখানে ঘরে বউ আছে। বড্ড দেরি হয়ে গেছে মুনতাহার আর সাইমুন কে নিয়ে ভাবতে চায় না।
মন বড় অদ্ভুত জিনিস কারো উপর থেকে উঠে গেলে সহজে সেখানে ঠাই দিতে পারে না। লুকানো ভালোবাসা টা হয়ত থেকে যায় কিন্তু বিশ্বাস, সম্মান থাকে না৷ এটাও ভালো করে জানে অবন্তিকা বেশি দিন ওই বাড়িতে থাকবে না। কারণ সমস্যা টা মুনতাহার ছিলো না সাইমুনের ছিলো।।
সাইমুনের বিয়ের আগের দিন মুনতাহার কাছে হাসপাতাল থেকে কল আসে। ডাক্তার টা ওদের পরিচিত ছিলো। মুনতাহা হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার রাহাতের মুখে যা শুনলো তা যেন মুনতাহার কাছে স্বপ্নের মত ছিলো,,
— মিসেস সাইমুন আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। আসলে অই দিন অন্য জনের রিপোর্ট এর সাথে আপনার রিপোর্ট এক্সচেঞ্জ হয়ে যায়৷
— কি বলছেন ডাক্তার এত বড় ভুল কি করে করলেন??
— সরি আমি নিজে বুঝতে পারছিনা এত বড় ভুল কি করে হলো । যে দম্পতির রিপোর্ট আপনাদের রিপোর্টের সাথে বদল হয়েছে তারা আবার দ্বিতীয় বার আসার কারণে বুঝতে পারি আসলে সমস্যা টা আপনার না সাইমুনের। তেমন গুরুতর কোন সমস্যা না ঠিকমতো চিকিৎসা নিলে ঠিক হয়ে যাবে।
মুনতাহা রিপোর্ট হাতে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছে। খুশিতে চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কিন্তু ভাগ্য তাকে কোথায় দাঁড় করিয়ে দিলো আজ এ খবর টা তার কাছে মূল্যহীন। এ রিপোর্ট মুনতাহার জীবন উলটপালট করে দিলো। ।
জীবনে একবার হলেও এমন পরিস্থিতিতে পড়া দরকার।
তাহলে কাছের মানুষদের আসল রূপ দেখা যায়।
তখন চির চেনা মানুষ অচেনা হয়ে যায়।
আতংকে বুক কেঁপে উঠবে “” আমি কি এ মানুষ টা কেই এতকাল ভালোবেসে এসেছি””
নিজের চেনা জীবন জগতের রং বদলে যেতে থাকে।
স্ত্রী কে চেনা যায় স্বামীর অভাবে, স্বামী কে চেনা যায় স্ত্রীর অসুস্থতায়। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে যদি স্বার্থ ঢুকে যায় সেটা আর সম্পর্ক থাকে না লেনদেন হয়ে যায়।
মুনতাহা নিজের কোন অক্ষমতা নেই এটা জানার পরেও সাইমুন কে জানায়নি। অনেকটা ইচ্ছে করে জানাতে চায়নি। মুনতাহা চেয়েছিলো সাইমুন ভালোবাসার টানে ফিরে আসুক। মুনতাহা সাইমুনের সব কিছু জেনে সাইমুন কে ভালোবাসে।
সাইমুনের সমস্যা না মিটলেও মুনতাহা মনে মনে ঠিক করে রেখেছে সাইমুন কে ছেড়ে কখনো যাবে না।
সাইমুন যদি বিয়েটা না করে খুশি মনে সাইমুন কে সব জানাবে।
এ জন্য হলুদের দিন থেকে মুনতাহা নিজেকে দূরে দূরে রেখেছে যাতে সাইমুন মুনতাহার ভালোবাসা অনুভব করতে পারে।
কিন্তু সাইমুন মুনতাহার ভালোবাসা কে মিথ্যা করে নতুন জীবনে পা বাড়ালো।
.
.
মুনতাহা সিভি নিয়ে রাশেদের কোম্পাণীতে গেলো। রাশেদ মুনতাহার কথা আগে বলে রেখেছে। মুনতাহা কে আশ্বাস দিয়ে বলছে,,
— মুনতাহা একটু ও ভয় পাবে না। ভালো রেজাল্ট এর চেয়ে কনফিডেন্স থাকা টা জরুরি। মনে সাহস রেখে কনফিডেন্সের সাথে উত্তর দিলে হবে। আর আমি তো আছি৷
— আমি চেষ্টা করব। আমার জীবনের প্রথম জব ইন্টারভিউ তাই একটু নার্ভাস লাগছে।
মুনতাহা ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে তাছাড়া রাশেদের স্পেশাল রেফারেন্স থাকার কারণে মুনতাহার জব টা হয়ে গেলো।
এবার মুনতাহা মা কে নিয়ে আলাদা বাসায় উঠবে। জব পাওয়ার প্রথম দিন বাসা খুঁজে ঠিক করে নিয়েছে। মুনতাহার মা কাঁদছে এ বাসা ছেড়ে চলে যাবে বলে। শত হলেও ছেলে, ছেলের বউ, নাতি নিজের পরিবার তো।
নাতি হুমামের জন্য মন কেঁদে কেঁদে উঠছে। হুমাম কে খুব ভালোবাসেন হুমাম ও দাদী ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না।সারাদিন দাদু দাদু করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখে। হুমাম কে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে।
.
.
তোর বাবার সব স্মৃতি জুড়ে আছে এ বাড়িটা ঘিরে,,
তোদের ছোটবেলা কাটানো মুহুর্ত এখনো চোখে ভাসছে,,
মুনতাহা কে কথা গুলো বলেই মুনতাহার মা মুখে কাপড় গুছে দিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন।
জগতের কি অদ্ভুত নিয়ম। কিছু শাশুড়ী বউ কে মেয়ের জায়গায় বসাতে পারে না কিছু বউ শাশুড়ী কে মায়ের স্থান দিতে পারে না। তবে ব্যাতিক্রমও কেউ কেউ আছে। মুনতাহা মা কে নিয়ে বের হবার সময় ভাবী কে ডেকে বলছে,,
— ভাবী আশা করি আজ থেকে সুখে থাকবা। তবে মনে রেখো তোমার ও একটা ছেলে আছে একদিন ছেলের বউ আসবে তুমিও শাশুড়ী হবে। তখন একজন শাশুড়ী কে তার পরিবার থেকে বিচ্ছেদ করলে কেমন লাগে সেটা বুঝবে।
দোআ করি তোমার ছেলের বউ যেন তোমাকে তাড়িয়ে না দেয়।
মুনতাহার ভাবী চুপ…
আর হ্যাঁ ভাইয়া ভেব না আমি সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছি আমি সময় হলে আবার আসবো।
হুমাম দাদীর বোরকা ধরে টানাটানি করছে যেন এ বাড়ি ছেড়ে চলে না যায়। মুনতাহার মা নাতি কে দুগালে কপালে চুমু দিচ্ছে,,
— দাদু ভাই তুমি বড় হলে এ বুড়িটাকে দেখতে যাইও। বুড়ি টা যে তোমার অপেক্ষায় থাকবে।
.
.
মুনতাহার নতুন জীবন ভালো যাচ্ছে। কথা শুনানোর কেউ নেই। বিলাসিতা না থাকলেও কোন কষ্ট নেই।
রাশেদ অফিসের সব ব্যাপারে মুনতাহা কে হেল্প করে। সময়ের সাথে সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক শক্ত হচ্ছে।
উকিলের সাথে মুনতাহার কথা হয়েছে উকিল বলেছে প্রসেসিং এ কিছুটা সময় লাগবে।
.
দিন যত যাচ্ছে মুনতাহার শাশুড়ী অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। অবন্তিকা বুঝতে পারছে কোথাও একটা গন্ডগোল আছে কিন্তু গন্ডগোল টা কি সেটা বুঝতে পারছে না। তবে খেয়াল করছে মুনতাহা চলে যাবার পর থেকে এ বাড়ি টা কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। কেউ কারো সাথে তেমন কথা বলে না।
সাইমুন কেমন জানি হয়ে গেছে মুনতাহা কে নিয়ে প্রায় আলোচনা হয় কিন্তু অবন্তিকার সামনে কেউ কোন কথা বলে না। সাইমুন তো প্রায় সময় বাসায় আসে না। অবন্তিকা কিছু জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে চলে।
আজকে সাইমুন কে জিজ্ঞেস করতে হবে আসলে ওর সমস্যা কোথায়। যত তাড়াতাড়ি জানতে পারব এখান থেকে বের হবার রাস্তা খুঁজে পাব। সাইমুন নিজ থেকে আমাকে ছেড়ে দিলে বাবাকে জব্দ করা যেত। আহানাফ যে আমার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। আমার ও এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
দরজার আওয়াজে অবন্তিকা ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলো।।
— আপনার সমস্যা টা কোথায় বলবেন??
— আপনাকে কেউ বলছে আমার সমস্যা আছে!!
— বলার কি দরকার আপনাদের আচরণে বুঝা যায়।
— বেশি বুঝতে যাবেন না। যত কম বুঝবেন ততই ভালো।
— আমি জানতে চাচ্ছি মুনতাহা আপুর সাথে আপনাদের পরিবারের কি সম্পর্ক?? আপনাদের চেহেরা বলে দেয় কিছুতো একটা আছে। বলবেন কাহিনী টা কি??
— সেটা তোমার না জানলেও চলবে।
— আপনি সিগেরেট খেয়েছেন ছিঃ
— খেয়েছি তো কি হয়েছে। যাও তো আমার মাথা খেও না।
— আমি কি মাথা খাব!! কোন পাগলের ফ্যামিলিতে এসে পড়েছি। বাবা কে বলতে হবে কার সাথে বিয়ে দিয়েছে। এখানে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় যেন মরা বাড়িতে বসবাস করছি।
— বসে আছেন কেন তাড়াতাড়ি চলে যান এখান থেকে। কান খুলে শুনে রাখুন কাউকে চাই না আমার বুঝেছেন।।
অবন্তিকা বেশ বুঝতে পারছে সাইমুনের মনে কেউ তো আছে। নাহয় বিয়ের এতদিনে সাইমুন কেন তার কাছাকাছি আসতে চায়নি। কখনো স্পর্শ করার চেষ্টা ও করেনি।
কিন্তু হিসেব মিলাতে পারছে না সাইমুন বিয়ে কেন করলো। কেমন জানি সবকিছু ধোঁয়াশে লাগছে। সত্যি টা চোখের সামনে থাকার পরেও সন্ধান মিলছে না।
সাইমুন সকালে অবন্তিকার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে রাতের ঘটনার জন্য। ওর নাকি মাথা ঠিক ছিলো না কি বলতে কি বলে ফেলেছে।
.
.
সাইমুন জানে না, যে কোম্পানীর সাথে নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করবে সে কোম্পানীতে মুনতাহা কাজ করে।
প্রজেক্ট এর কাজে করতে গিয়ে মুনতাহা কে রাশেদের সাথে হাসি খুশি দেখে রাশেদ হতভম্ব হয়ে আছে। মুনতাহা এখানে কি করছে।
সাইমুন খবর নিয়ে দেখে মুনতাহা এই কোম্পানীতে নতুন জয়েন করেছে। সবাই বলাবলি করছিলো রাশেদের সাথে মুনতাহার সখ্যতা থাকার কারণে নতুন জয়েন করে নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে….
…চলবে…..