দৃষ্টির বাহিরে

দৃষ্টির বাহিরে !! Part-07 ( শেষপর্ব )

কি বলছো কি? কে করবে এমনটা?

জানিনা।

আমি একবার হাসপাতালে যাবো।

না না, তোমার যাওয়ার দরকার নেই। আমি তোমাকে নতুন করে আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে দিবো না, আর কাল আমাদের বিয়ে।

জয়া! কিছু হবে না আমার। তুমি শুধু শুধু টেনশন করোনা। আর তাছাড়া আমি যেহেতু ইরফানিকে আঘাত করেছিলাম তাই আমাকে পুলিশ দেখা করতে বলেছে।

আমিও যাবো তোমার সাথে।

না, তুমি গিয়ে কি করবে? আমি তাড়াতাড়ি চলে আসবো!

ফয়সাল হাসপাতালে চলে গেল! আমার খুব ভয় লাগছে না জানি ওর কি বিপদ হয়!

রাত ১১টা বেজে গেছে ফয়সাল এখনো আসছে না। আমার খুব টেনশন হচ্ছে, অনেকবার কলও করেছি কিন্তু ফোন ধরছে না।
কিছুক্ষন পর ফয়সাল আমাকে ফোন দিয়ে বলল,
হ্যালো জয়া!

তুমি ঠিক আছো তো? কিছু হয়নি তো তোমার? আর ফোন রিসিভ করছিলে না কেন?

জয়া আমি ঠিক আছি কিন্তু

কিন্তু কি? ইরফানি কি বেঁচে আছে?

না।

তাহলে?

ইরফানির লাশের পাশে নীলের লাশ!

কি? কি বলছো এসব? তুমি তো বলেছিলে নীল মা…

হ্যাঁ, কিন্তু নীলের লাশ এখানে কিভাবে? আর ওর মৃত্যুর তো ১বছর হয়ে গেছে কিন্তু এই লাশটা দেখে মনে হচ্ছে কয়েকঘন্টা আগে মারা গেছে! আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সামনে খুন ২টা হইছে!

কিন্তু এসব কিভাবে সম্ভব? কে করেছে খুন?

ওরা ২জন ২জনকে খুন করেছে!

কি? কিভাবে সম্ভব।

জানিনা।

সে যাই হোক তুমি ফিরে এসো। আমার টেনশন হচ্ছিলো, আবার ফোনও রিসিভ করছিলে না।

ফয়সাল যা বলল সেটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! নীল কিভাবে!! কিন্তু সবার সামনে বিশ্বাস করার অভিনয় করলাম। কেউ তো আর সত্তিটা জানে না।

আমি একবার নীলের বাবা-মা সাথেও দেখা করতে যাবো ফয়সাল।

কেন জয়া?

উনাদের সাথে কথা বললে উনাদের একটু ভালো লাগত।

ঠিক আছে যাও।

আমি নীলের বাবা-মার সাথে দেখা করে এলাম। খুব ভেঙে পড়েছে নীলের মৃত্যুতে। একমাত্র ছেলেকে হারলে কষ্ট পাওয়ারই কথা! মিমির বাবা-মাও মনে হয় এতটা কষ্ট পেয়েছিলো!

আজ আমাদের বিয়ে, ফয়সালকে বেশ চিন্তত লাগছে! চিন্তার কারন নিশ্চই নীল!
আমি ফয়সালকে অনেকবার বুঝিয়েছি যা হয় ভালোর জন্যেই হয় তবুও টেনশন করছে!
এদিকে আমি নতুন বউ সেজে বসে আছি, ওর কাছেও যেতে পারছিনা!

বিয়ের কাজকর্ম সব শেষ! আমি বাসরঘরে বসে আছি। ফয়সাল রুমে প্রবেশ করলো কিন্তু ওকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে!

তুমি টেনশন কেন করছো?

আমাদের প্লান তো ছিলো নীলকে আর ওদের পরিবারকে শুধু কষ্ট দেওয়া, মেরে ফেলা নয়! কিন্তু নীল আর ইরফানি তো মারা গেল! এখন কি হবে?

কিছু হবে না!

তোমার অভিনয়টা খুব ভালো ছিলো, কারো সন্দেহ হয়নি তোমার ওপর।

অভিনয়টা তো করতেই হতো। ওই নীল আমার বোন মিমি আর ওর বাচ্চাকে মেরে ফেলছে! শুধু তাই না, ওর কারনে আমার বাবা-মা মারা গেছে! আমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন! মিমি আপুর আত্মহত্যা সহ্য করতে না পেরে তিনিও আত্মহত্যা করে বসেন কিন্তু ওনি সত্যি জানতে পারলেন না! মিমি আপু নির্দোষ ছিলো। আমার পরিবারের সবাইকে অনেক অপমান সহ্য করতে হইছে! সবাই আমার আপুর চরিত্র নিয়ে কথা বলছে। সবাই শুধু আমাদের ঘৃণা করেছে। আমিও সেই ঘৃণা দেখতে চেয়েছিলাম নীলের পরিবারের প্রতি সবার। আর তুমি নীল সেজে যা যা করছো তাতে আমার ইচ্ছে পূরন হইছে।
বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পর আমার মাও মারা যায়। তারপর একদিন মিমি আপুর একটা ডায়রি পড়ে আমি সত্তিটা জানতে পারি! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম তুমিই দোষী! কিন্তু পরে সত্তিটা জানতে পারি।
তারপর তোমার জামিন করাই।
তোমাকে আমার প্লানিং এ সামিল করি।
আমরা সেদিন নীলকে খুন করিনা! ওকে কিডন্যাপ করি। তারপর ওকে আমাদের স্টোর রুমে বেঁধে রাখি! আর তারপর….

আর তারপর আমি তোমাকে বিয়ে করি! আর আমরা এমন অভিনয় করি যাতে মনে হয় আমি নীল, নীলের বাসায় গিয়ে ওর বাবা-মাকে ওর ব্যাপারে রাগিয়ে দেওয়া! নীলের ওই ডায়রি! ওইটা তো আসলে নীলের লেখা ছিলোই না! ওইটা তো আমাদের লেখা ছিলো! আর তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার! তোমাকে খুনের চেষ্টা এসব সব আমাদের নাটক ছিলো, এসব আমরা এ জন্যে করেছি কারন নীলকে ইরফানির সামনে নীলকে খারাপ প্রমাণ করার জন্যে! যাতে ইরফানি নীলকে ভুল বুঝে।

হ্যাঁ, এই জন্যে আমিও ইরফানির সাথে ইচ্ছে করে দেখা করি আর নীলের বাবা-মার সামনেও গিয়ে নাটক করি কারন আমি জানতাম, আমি যতই নীলের ভালো স্ত্রী হই না কেন! উনারা ইরফানিকেই নীলের বউ বানাবে! কারন ওদের কাছে টাকাই সব।
আর বোকা ইরফানি আমাকে ওর আর নীলের আগের ভয়েস রেকর্ডিং শুনাইছে। ও তো আর জানতো না! নীল আমাদের কাছে বন্দি।

ঠিক তারপর তুমি বাসা থেকে চলে যাওয়ার নাটক করলে, ইরফানিও ভাবলো নীল তোমাকে ভালোবাসে না! তুমি নীলের জীবন থেকে সরে গেছো! আর ঠিক তারপর ইরফানি যখন নীল মানে আমার সাথে দেখা করতে আসছিলো তখন আমি তোমাকে ফোন করে বাসায় আসতে বলি আর ইরফানিকে দরজার বাহিরে দেখে একটা মিথ্যে গল্প বানাই যে, আমি নীলকে খুন করেছি।
ইরফানি আমার ওপর রেগে গিয়ে তোমাকে মারার চেষ্টা করে কিন্তু ও জানত না এসব আমাদের সাজানো! সব আমাদের প্লান। কিন্তু নীলকে ও ভুল বুঝলই না উলটে আমাদের মারার চেষ্টা করল!

আর ঠিক সেসময় নীল আমাদের এখান থেকে পালায় আর ইরফানির সাথে দেখা করতে হাসপাতালে যায়! ইরফানিকে কিডন্যাপ করার জন্যে ও একটা বন্দুক নিয়ে হাসপাতালে যায়! কিন্তু ইরফানি ভাবতে থাকে নীল তো মারা গেছে তাহলে এটা কে? এটা নিশ্চই আমাদের নতুন কোনো প্লান!
আর নীলের হাতে বন্দুক থাকায় ও ভাবে নীল ওকে মারতে এসেছে, তাই ও ভয়ে ওর পেটে ছুরি চালিয়ে দেয়! কিন্তু নীলের হাতে একটা বন্দুক ছিলো আর মৃত্যুর পূর্বে ও ইরফানিকে গুলি করে দেয়।

আর সব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু করার নেই, ওদের ভাগ্য এটাই ছিলো।

হয়তবা। কিন্তু এটা তো ভালো হইছে আমাদের কেউ সন্দেহ করেনি।
আর সবার দৃষ্টির বাহিরে তুমি তোমার প্রতিশোধ টা নিতে পেরেছো!

আমি না ফয়সাল। সবার দৃষ্টির বাহিরে আমি ছিলাম না, ও ছিলো। আর এই প্রতিশোধ শুধু আমার একার ছিলো না! ওরও ছিলো!

ও মানে? কে?

মিমি আপু।

কি! মিমি কোথায় থেকে আসবে? মিমি তো মারা গেছে!

আপু মারা যায় নি।

মানে?

দরজায় হঠাৎ কেউ একজন নক করলো। মনে হয় ও এসেছে!

আমি গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম! হ্যাঁ ওই এসেছে!
ফয়সাল মিমি আপুকে দেখে চমকে গেল!

মিমি তুমি!! তুমি বেঁচে আছো? এটা কিভাবে সম্ভব?

হ্যাঁ, বেঁচে আছি আমি, আজ যে আমি বেঁচে আছি সেটাও শুধু জয়ার কারনে।

জয়ার কারনে!! কিন্তু জয়া তো আমাকে কিছু বলেনি।

আমি নিষেধ করেছিলাম বলতে।

আর তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?

একটা অনাথ আশ্রমে ছিলাম আমি।

সেদিন কি হয়েছিলো মিমি?

সেদিন যখন আমাকে দিয়ে নীল চিঠি লেখায় তোমার নামে আমি সেদিন আন্দাজ করতে পেরেছিলাম নীল আমাকে খুন করবে কিন্তু বুঝেও কোনো লাভ ছিলো না! ঘুমন্ত অবস্থায় ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেয়, তখন জয়া আমার রুমে আমার সাথে ছিলো, ও শুধু বাথরুমে গিয়েছিলো।
তখন নীল আসে আর আমাকে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে ওখান থেকে পালায়। জয়া অনেক কষ্টে আমাকে বাঁচিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু ও বাবা-মাকে কিছু জানায় না! যেহেতু আমরা সেদিন ভার্সিটির হলে ছিলাম আর ভার্সিটি ছুটি ছিলো বলে প্রায় সবাই বাসায় চলে গিয়েছিলো, আমরাও যেতাম, জয়া আমাকে নেওয়ার জন্যেই এসেছিলো। কিন্তু নীল আমাদের জীবনটা ধ্বংস করে দিলো। আমাদের অনাথ করে দিলো! আমাদের বাবা-মাকেও কেড়ে নিলো!

আমি আপুকে তো বাঁচিয়ে নেই কিন্তু আপুর বাচ্চাটা মারা যায়। আপু আর আমি ঠিক করি আমাদের সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিবো আমরা! তাই আপু সবার আড়ালে থাকে আর আমি তোমার সাথে মিলে নীলকে শাস্তি দেই। কিন্তু নীলের বাবা-মা আমার বাবা-মা সাথে দেখা করতে আসে, তখন বাবা-মাকে অনেক বাজে বাজে কথা শুনায়, যার কারনে বাবা আত্মহত্যা করে আর মাও মারা যায়!

হ্যাঁ জয়া আর তুমি না থাকলে আজ নীল শাস্তি পেত না! ও তো তোমার সাথেও অন্যায় করেছে। কিন্তু তুমি নিজের ফ্রেন্ডকে সাহয্য না করে আমাদের কেন সাহয্য করেছিলে?

কারন আমি অন্যায়কারীদের সাথে থাকিনা! সে যেই হোক না কেন। আর একটা কারন হলো জয়া!

জয়া?

হ্যাঁ, আমি ওকে প্রথম দিন থেকেই ভালোবাসতাম। আর আমি এটাও জানতাম জয়া তোমার বোন। তোমার বাবাকে রক্ত দেওয়ার সময় আমি সব তথ্য নেই জয়ার আর তোমার ফ্যামিলির ব্যাপারে। আর যখন নীল তোমার সাথে এসব অন্যায় করে আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়, আমি নীলের পক্ষ না নিয়ে তোমাদের সাপোর্ট করি।

আমি আন্দাজ করেছিলাম তুমি জয়াকে ভালোবাসো, তাই জয়াকে তোমাকে বিয়ে করতে বলি! আজ তোমাদের বিয়ে হইছে শুনে এ জন্যে আমি অনেক খুশি। আমার বোনকে তোমার থেকে ভালো কেউ রাখতে পারবে না! আমি আসি। ভালো থেকো তোমরা। আর নীলের মৃত্যু নিয়ে ভেবেনা আমার অপর কোনো প্রভাব পড়েছে, ওর মতো মানুষদের বেঁচে থাকার অধিকার এমনিতেও নেই।

কোথায় যাবে তুমি আপু?

অনাথ আশ্রমে। আমার ইচ্ছে পূরণ করতে। আমি অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের মায়ের মতো ভালোবাসব! নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি তো কি হয়েছে ওদের মধ্যে নিজের সন্তানকে খুঁজে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবো।

না আপু তোমাকে আমি যেতে দিবো না। এতদিন পর তোমার সাথে দেখা হলো! তুমি এভাবে যেতে পারোনা।

ফয়সাল ওকে সামলাও। আমি আসছি। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।

মিমি আপু চলে গেল। আমি ফয়সালের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলাম। এই কান্নাটার মানে ছিলো, একদিকে নিজের বোন চলে যাওয়ার কষ্ট অন্যদিকে আমাদের নতুন জীবন শুরু করার আনন্দ!

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *