Childhood marriage

Childhood marriage 3 !! Part- 31

হসপিটালের রুমটা ছোট,রুমের ঠিক মাঝখানে একটা বেড,একপাশে একটা চেয়ার আর ছোট্ট একটা টেবিল।দক্ষিণ দিকে ছোটো খাটো একটা জানালা,সেই জানালা দিয়ে আসা এক চিলতে ভোরের আলোই জানান দিচ্ছে যে সকাল হয়ে গেছে।
ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোর ছটা চোখে এসে পড়তেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ছোঁয়ার।শরীরটা প্রচণ্ড ওর তাই উঠে বসতেও বেশ বেগ পেতে হলো,গলাটা একেবারে শুকিয়ে আছে,একটু পানি খেতে পারলে…
টেবিলের উপর একটা পানির জগ দেখা যাচ্ছে,ওদিকে হাত বাড়াতেই কেউ পানিভর্তি একটা গ্লাস ওর সামনে বাড়িয়ে ধরলো
ছোঁয়াঃ আ..আপনি…
সায়নঃ এখন কেমন আছো?মাথাব্যথাটা কি এখনও আছে?
ছোঁয়াঃ মাথা..ব্যথা?ক..কই নাতো,আরতো..নেই…
সায়নঃ হুম ভালো,কি হলো পানিটা নাও..ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন?পানিটা খাবেতো নাকি?
ছোঁয়াঃ ও হ্যাঁ দিন
সায়নঃ আচ্ছা শোন,ডক্টরের সাথে আমার কথা হয়ে গেছে,বিকেলেই তোমাকে রিলিজ দিয়ে দিবে
ছোঁয়াঃ আচ্ছা
সায়নঃ তুমি ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নাও,আমি বরং তোমার ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করি
(বেড থেকে নেমে দু পা হাঁটতেই শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেল ছোঁয়ার,ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা মেঝেতে পড়ার আগেই একজোড়া হাত ওর দুকে এগিয়ে আসলো,হাতের মালিক আর কেউ না,সে সায়ন)

সায়নঃ জানতাম এমন কিছুই হবে,তাইতো আড়ালেই দাঁড়িয়ে তোমার দিকে লক্ষ্য রাখছিলাম
ছোঁয়াঃ থ্যাঙ্কস
সায়নঃ এখন চুপচাপ বিছানায় বসে থাকবে,এমদম নামার চেষ্টা করবে না বুঝেছো?
ছোঁয়াঃ কিন্তু..আমাকেতো একটু ওয়াশরুমে…
সায়নঃ ওহ ওয়েট…
ছোঁয়াঃ কিছু বুঝে উঠার আগেই উনি আমাকে কোলে তুলে নিলেন!একি,কি করছেন এসব?আমি একাই যেতে পারবো তো…
সায়নঃ সেতো একটু আগে নিজের চোখেই দেখলাম
ছোঁয়াঃ দেখুন আপনি…
সায়নঃ শসসস…
(আর কোন বাঁধা দিল না ছোঁয়া,সায়ন ওকে সোজা ওয়াশরুমে নিয়ে গেল তারপর ওকে নামিয়ে দিয়ে বাইরে চলে আসলো)
সায়নঃ তোমার হয়ে গেলে আওয়াজ দিও আমি বাইরেই আছি
(কিছুক্ষণ পর)
বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বিছানায় বসে আছে ছোঁয়া,খাবারের ট্রে হাতে সায়নকে আসতে দেখে উঠে বসলো।সায়ন এসেই সোজা ওর সামনে বসে পড়লো,চামচে খাবার তুলে ছোঁয়ার দিকে বাড়িয়ে ধরলো
ছোঁয়াঃ আ..আমি একাই পারবো,আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না
সায়নঃ জানিতো পারবে কিন্তু তবু্ও আমি…
ছোঁয়াঃ কেন জানি আর না করতে পারলাম না,উনার তুলে দেওয়া খাবারগুলো চুপচাপ খেতে লাগলাম
সায়নঃ আমি জানি তোমার আমাকে মনে নেই,আমাকে দেখলেই তোমার মনের ভেতরে হাজারো প্রশন ঘুরপাক খাচ্ছে আর সেগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে নিজের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছো কিন্তু তবুও আমাকে যে তোমার সামনে আসতেই হবে।অনেক ভালোবাসি তোমাকে তাই এই কঠিন সময়ে তোমার পাশে যে আমাকে থাকতেই হবে(মনে মনে)

ছোঁয়াঃ আচ্ছা সত্যিই কি আপনি আমার বর?
সায়নঃ ওর কথাটা শুনে চমকে উঠলাম।মা..ম..মানে?
ছোঁয়াঃ আসলে আমি না ঠিক মনে করতে পারছি না,সবাই বলছে আপনি আমার বর কিন্তু আমার না মনে হচ্ছে আপনাকে এই ফার্স্ট দেখলাম।আচ্ছা আপনিই বলুন,এমনটা কিভাবে সম্ভব!কখনও সম্ভব না তাইনা?
সায়নঃ ওর বলা কথাগুলো যেন ছুরির মতো গিয়ে বুকে বিঁধছে,সহ্য করতে পারছি না কিন্তু…
ছোঁয়াঃ কি হলো চুপ করে গেলেন যে!আচ্ছা আপনিই উত্তরটা দিব না,আপনি যা বলবেন আমি বিশ্বাস করবো প্রমিজ…বলুন না সত্যিই কি আমাদের বিয়ে…
সায়নঃ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম।তোমার কি মনে হয়?
ছোঁয়াঃ আমারতো বিশ্বাসই হচ্ছে না কিন্তু…
সায়নঃ কিন্তু কি?
ছোঁয়াঃ বাব-মা যখন বলছে তখন..আসলে উনারাতো আর আমাকে মিথ্যে বলবেন না তাইনা?আর তাছাড়া সবাই যখন একই কথা বলছে তাহলেতো…
সায়নঃ তাহলে শুধু শুধু প্রশ্ন করছো কেন?উত্তরটাতো তুমি আগে থেকেই জানো
ছোঁয়াঃ না মানে আমি..আসলে…
সায়নঃ হা করো,খাবারটা শেষ করতে হবে কিন্তু…
ছোঁয়াঃ হুম…আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন করব?
সায়নঃ কি প্রশ্ন?
ছোঁয়াঃ সত্যিই কি আমি গত এক বছর ধরে কোমায় ছিলাম?
সায়নঃ কেন কোন সন্দেহ আছে?
ছোঁয়াঃ না মানে,ওই আরকি…
সায়নঃ তুমি না বড্ড বেশি বকবক করছো,মনে হচ্ছে গত এক বছরে কথা না বলতে পারার শোধ তুলছো
ছোঁয়াঃ ঠিক আছে ঠিক আছে আর কিছু বলতে হবে না,এই আমি চুপ করলাম আর কিন্তু মুখ খুলছি না
সায়নঃ থ্যাঙ্ক গড,দেখো আবার কথার খেলাপ করো না কিন্তু
ছোঁয়াঃ ও নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না,আপনি বরং নিজের চরকায় তেল দিন
সায়নঃ অদ্ভূত লাগছে,ছোঁয়াকে এমন অদ্ভূত বিহেভ করতে একবারই দেখেছিলাম সেই বান্দরবান ট্রিপে আর কক্ষণও ওকে এভাবে দেখিনি।তবে কি ও এমনই নাকি ওর কথা অনুযায়ী সেবারের মতো এবারেও এটা ওর একটা ডিফেন্সিভ মেকানিজম?
ছোঁয়াঃ নাহ ছোট ছোট চুলগুলো চোখের সামনে এসে খুব জ্বালাচ্ছে দেখছি,একটা রাবার ব্যাণ্ড হলে ভালো হতো।উনাকে কি একবার বলে দেখবো?কিন্তু কিভাবে চাইবো,খুবতো বড় মুখ করে বললাম আর মুখ খুলবো না তাহলে এখন…পেয়েছি,আস্তে করে গলা খাঁকারি দিলাম
সায়নঃ কি?কিছু বলবে?

ছোঁয়াঃ বেটা গাধা নাকি?আরে বাবা,বলব বলেইতো এমন করছি এটা আবার জিজ্ঞেস করার কি আছে?(মনে মনে)
সায়নঃ কি হলো চুপ করে থাকলে যে!কিছু লাগবে?
ছোঁয়াঃ এক কাজ করি,ইশারায় বুঝিয়ে বলি দেখি বেটা বুঝতে পারে কিনা
সায়নঃ আরে!হাত-পা নাড়িয়ে ও আসলে কি বোঝাতে চাইছে?কিছুইতো বুঝতে পারছি না…
ছোঁয়াঃ এতো দেখি আস্ত একটা ঢেঁড়স,এতো সহজ একটা ইশারা গেস করতে পারছে না!(মনে মনে)
সায়নঃ এসব কি হচ্ছে ছোঁয়া?যা বলতে চাইছো পরিষ্কার করে বলোনা,শুধু শুধু এসব অদ্ভূত মুখভঙ্গি কেন করছো?মানুষ দেখলেতো পাগল বলবে…
ছোঁয়াঃ বলুক তাতে আপনার কি?আচ্ছা এক কাজ করি একটা লাস্ট ট্রাই করে দেখি(মনে মনে)
সায়নঃ ওই দেখো আবার শুরু হয়ে গেল,আরে বাবা এসব ছেড়ে কি দরকার পরিষ্কার করে বলো না…
ছোঁয়াঃ রাবার ব্যাণ্ড,চুল বাঁধবো
সায়নঃ তা এতক্ষণ এসব নাটক না করে,ঝটপট বলে ফেললেইতো পারতে
ছোঁয়াঃ কি করে বলবো?আপনিই না একটু আগে আমাকে কথা বলতে বারণ করলেন…
সায়নঃ এটা আবার কখন বললাম?আমিতো শুধু বললাম তুমি একটু বেশি কথা বলো
ছোঁয়াঃ সে যাই বলুন,ব্যপারটাতো একই হলো নাকি?
সায়নঃ আচ্ছা বাবা ঠিক আছে আমি সরি,আর কক্ষণও এমন হবে না।এবার খুশিতো?
ছোঁয়াঃ হুম খুশি,এখন কি একটা রাবার ব্যাণ্ডের ব্যবস্থা করা যাবে?চুলগুলো খুব জ্বালাচ্ছে
(ছোঁয়ার কথা শুনে সায়ন মুচকি হাসলো তারপর আস্তে আস্তে ওর পাশে গিয়ে বসে পড়লো)
ছোঁয়াঃ এটা কি হলো?আমিতো রাবার ব্যাণ্ড চাইলাম তাহলে আপনি…
সায়নঃ শসসস…ধীরে ধীরে ওর চুলগুলো বাঁধার জন্য হাত বাড়ালাম
ছোঁয়াঃ এটা আপনি আগে থেকেই…
সায়নঃ হ্যাঁ কাল লোপা দিয়ে গিয়েছিল,বলছিল দরজার হবে
ছোঁয়াঃ ঠিক আছে,আমাকে দিন আমি একাই বাঁধতে পারবো,আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না
সায়নঃ আমি জানি তুমি পারবে কিন্তু তবুও তোমার হয়ে তোমার জন্য এটুকুতো আমি করতেই পারি।আসলে ভালোবাসার মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মজাই আলাদা
ছোঁয়াঃ উনার কথাটা বুকে যেন তীরের মতো বিঁধলো,আমার কি এখন উনাকে বাঁধা দেওয়া উচিত নাকি…
সায়নঃ তোমার জন্য অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সেই সৌভাগ্য আমারতো খুব একটা হয়নি তাই এখন…
ছোঁয়াঃ দে..দেখুন,আপনাকে আমার কিছু কথা বলার আছে
সায়নঃ সে নাহয় পরে বলো এখন একটু ঘুমাও,একটু পরেই আবার মা-বাবা তোমাকে নিতে আসবে
ছোঁয়াঃ হ্যাঁ কিন্তু কথাটা বলা খুব জরুরী,আসলে আমি…
(ছোঁয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই ডক্টর ইফতেখার দরজায় নক করলেন,ছোঁয়ার চেকাপ শেষে ওর দিকে মুচকি হেসে বললেন)
ডক্টরঃ এতো তাড়াতাড়ি এতোটা ইমপ্রুভমেন্ট আমিও কিন্তু এক্সপেক্ট করিনি,আঙ্কেল আন্টি ইনসিস্ট করছিলো তাই বাসায় নিয়ে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছিলাম বাট এখন মনে হচ্ছে ডিসিশনটা একদম ঠিক ছিল।She is completely alright
ছোঁয়াঃ থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর
ডক্টরঃ You should rest now আর সায়ন,একটু আমার চেম্বারে আয় তোকে কিছু ইন্সট্রাকশন দেওয়ার ছিল
সায়নঃ ঠিক আছে ভাইয়া,তুমি যাও আমি এক্ষুণি আসছি…

চৌধুরী ম্যানসন…
এই বাড়িটাতেই জীবনের অনেক বড় একটা সময় পার করেছে ছোঁয়া,সুখ দুঃখের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িটার সাথে।মূল ফটকে পা দিতেই সবকিছু যেন ওর চোখের সামনে পরিষ্কার ভেসে উঠছে আর তারসাথে ভাসছে আবছা কিছু ছবি,হাজার চেষ্টা করেও যার কিছুই মনে করতে পারছে না।
সায়নঃ এই যে ম্যাডাম,এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি ভেতরেও যাবে?
ছোঁয়াঃ ভেতরে?ও হ্যাঁ যাচ্ছি
সায়নঃ এক মিনিট,ঝটপট ওকে কোলে তুলে নিলাম তারপর সোজা ভেতরের দিকে পা বাড়ালাম
ছোঁয়াঃ আরে আরে কি করছেন?সবার সামনে এভাবে…(ফিসফিস করে)
সায়নঃ কি সমস্যা?নিজের বউকেইতো কোলে নিয়েছি আর তাছাড়া সবাই জানে তুমি অসুস্থ তাই কেউ কিছু মনে করবে না(ফিসফিস করে)
ছোঁয়াঃ হ্যাঁ কিন্তু…
সায়নঃ শসসস…
(দোতলায় উঠে আসলো সায়ন,নিজের ঘরের সামনে আসতেই থামিয়ে দিল ছোঁয়া)
ছোঁয়াঃ আমাকে আমার ঘরে নিয়ে চলুন প্লিজ…
সায়নঃ তাইতো যাচ্ছি…
ছোঁয়াঃ উহু এই ঘর না,আমি বলতে চাইছি…
সায়নঃ হুম বুঝেছি

(ছোঁয়াকে ওর ঘরে নিয়ে গেল সায়ন,যে ঘরে বিয়ের আগে ছোঁয়া থাকতো।হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন মিসেস আসমা চৌধুরী)
মাঃ একি ছোঁয়া,তুই এই ঘরে কেন?তোরতো এখন সায়নের ঘরে…গত এক বছর ধরেইতো ও নিজ হাতে…
সায়নঃ মা এক মিনিট,আমাদের একটু একা ছেড়ে দেবে প্লিজ?
(মিসেস চৌধুরী বেরিয়ে গেলেন,সায়ন ছোঁয়ার দিকে নজর দিল,ও তখন মাথা নিচু করে বিছানায় বসে আছে।সায়ন দরজাটা লাগিয়ে ছোঁয়ার দিকে এগিয়ে আসলো তারপর ওর হাতে হাত রেখে ওর সামনে মেঝেতে বসে পড়লো)
সায়নঃ হসপিটালে তুমি কিছু বলতে চাইছিলে,সরি আমি তখন শুনতে পারিনি।এখন বলো কি বলবে,কোন সমস্যা?
ছোঁয়াঃ আ..আসলে আমি না আপনার ব্যাপারে কিছুই মনে করতে পারছি না,অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু তবুও…জানেন আপনার ব্যাপারে লাস্ট কোন জিনিসটা আমার মাথায় আসছে?সেই যে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন সেটা।তারপর থেকে প্রতিটা দিন আমি আপনাকে শুধু ঘৃণায় করে এসেছি,আপনাকে একদমই সহ্য করতে পারিনা আমি।আমার এতো রেস্ট্রিকশনের মাঝে বড় হওয়া,সবার এতো শাসন,বাঁধা সবকিছুর জন্য শুধুমাত্র আপনাকেই দায়ী করে আসছি
সায়নঃ হুম আমি সব জানি
ছোঁয়াঃ এখন সবাই বলছে আপনার সাথে আমার…এখন হুট করে সবকিছু ভুলে আপনাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়াটা আমার পক্ষে…
চলবে….