পরিণয়ে পরিণতি !! Part- 21
মুনতাহা মুখ থেকে অন্যমনস্ক হয়ে বের হলো
সাইমুন!!
রাশেদ ঠিক শুনতে পায়নি মুনতাহা কি বলছে।
— কি হয়েছে মুনতাহা!! একি চেহেরার হাল বানিয়েছ??
— ও রাশেদ তুমি??
— অন্য কাউকে ভেবেছিলে??
— আরে না কাকে ভাববো!
মুনতাহা জামা ঠিক করে উঠে লাইট জ্বালিয়ে,,
— তুমি কখন এসেছ??
— একটু আগে। কি হয়েছে তোমার অফিসে যাচ্ছ না। কল দিলেও ধর না
— কয়েকদিন ধরে শরীর টা খারাপ। মোবাইল কোথায় আমি নিজেও জানিনা।
— আমার কাছে লুকাবে না আমি সব বুঝতে পারি। খেয়াল করছি ডিভোর্স এর পর থেকে তুমি কেমন আনমনা হয়ে গেছ।
— ও কিচ্ছু না।
— দেখো মুনতাহা অতীত কে নিয়ে বেশি ভাবতে নেই। যত অতীত কে গুরুত্ব দিবে ততই তুমি সমুদ্রের তলদেশে পৌছে যাবে সেখান থেকে চাইলে আর উঠতে পারবে না। জীবন টা অনেক সুন্দর। তুমি চাইলে তোমার জীবন আগের চাইতে বেশি সুন্দর হবে।
— কিভাবে আমি যে কিছু ভাবতে পারছিনা।
— আমাদের আসে পাশে অনেকে আছে।। শুধু সুখের সন্ধান বের করে নিতে হয়। আর আমি তো আছি তোমার পাশে।
রাশেদ কি বুঝাতে চাচ্ছে। ও তো ভুল ভাবছে আমার পক্ষে আবার কোন সম্পর্কে যাওয়া সম্ভব না। নতুন করে আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারব না।
“বিশ্বাস অনেক মজবুত জিনিস কিন্তু একবার ভেঙ্গে গেলে পৃথিবীর সবথেকে দূর্বল জিনিসে পরিণত হয় ” চাইলে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না।
পুনঃরায় বিশ্বাস করতে কারো কারো তো আজীবন সময় লেগে যায়।
রাশেদ মুনতাহার চোখের সামনে হাত নেড়ে,,
— কি এত ভাবছ মুনতাহা??
— কিছু না। তুমি বসো আমি নাস্তা নিয়ে আসি।
এর মধ্যে মুনতাহার মা নাস্তা নিয়ে এসে,,
— বাবা খেয়ে নাও। আজ প্রথম গরীবের বাসায় আসছ।
— মা এরকম কথা বললে কখনো আসবো না।
– আচ্ছা বাবা আর বলব না এবার খেয়ে নাও।
মুনতাহা হাত মুখ ধুয়ে আসো একসাথে খাব।
মুনতাহা ফ্রেশ হয়ে রুমে ঢুকতেই ওকে দেখে রাশেদ মুনতাহার মা কথা অফ করে দিলো। কিছক্ষণ চুপ থেকে ইচ্ছে করে কথা অন্য দিকে ঘুরাচ্ছে মুনতাহা বুঝেও কিছু বলল না। মুনতাহা ভাবছে,,
রাশেদ কি কথা বলছে যে আমাকে দেখে চুপ করে গেলো।
— আসো আসো এবার লক্ষী মেয়ের মত চুপটি করে বসে খাও।
মুনতাহা খাচ্ছে আর লক্ষ্য করছে রাশেদ ইশারা দিয়ে মা কে কিছু বুঝাচ্ছে মুনতাহা তাকাতেই চোখ ঘুরিয়ে নিলো
— আজ অনেক খেয়েছি ২ দিন না খেলেও চলবে। আজ একটা কাজ আছে চলে যেতে হবে।
মুনতাহার মা বলছে,,
— আর একটু থাক না একদম ডিনার করে পরে যেও।
— না মা আজ যাই অন্য দিন আসব।
— মুনতাহা আমি অফিসে বলে দিব তুমি কিছুদিন রেস্ট করো। আর হ্যাঁ একদম মন খারাপ করবেনা। প্লিজ কল দিলে ধরিও নিজের যত্ন নিও।
রাশেদ নানা ভাবে কথা দিয়ে মুনতাহা কে বুঝাতে চাচ্ছে মুনতাহা কে রাশেদ পছন্দ করে। সরাসরি বলতে পারছে না যদি মুনতাহা মাইন্ড করে। যদি ভাবে মুনতাহার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে।।
একজন কে ভুলার জন্য অন্য কাউকে ডাল হিসাবে ধরা ভুল ছাড়া আর কিছুই না। তাতে আর যাইহোক ভালোবাসা থাকে না। কেবল জমানো ক্ষত পূরণ করার বৃথা চেষ্টা করা।
আমি দ্বিতীয় বার জীবন যুদ্ধে নামতে চাই না। এক জীবনে কতবার হারা যায়। আমি সত্যি খুব ক্লান্ত…
.
.
অবন্তিকা সাইমুনের ডিভোর্স হয়ে গেলো। সাইমুনের জন্য অবন্তিকার খারাপ লাগছে এ বিয়েটার জন্য সাইমুন মুনতাহা কষ্ট পাচ্ছে। জীবনের কিছু ঘটনা আমাদের হাতে থাকে না কেমন জানি দমকা হাওয়ার মত সব ঘটে যায়। অবন্তিকা চেষ্টা করেও মুনতাহার সাথে কোনভাবে যোগাযোগ করে উঠতে পারেনি।
.
অবন্তিকা আহানাফ কে বলে দিয়েছে ওর বাবা আহানাফের বাসায় যাবে বিয়ের প্রস্তাব দিতে।
রেজাউল করিমের কিছুটা লজ্জা লাগছে কিভাবে বলবে। আহানাফ কে কয়েকবার এলাকার ছেলেদের দিয়ে মারধোর করেছে আহানাফ এর মা কে যা নয় তা বলে হুমকি দিয়েছে। আজ তাদের বাসায় মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে হচ্ছে।
জীবন কাকে কখন কার দুয়ারে দাঁড় করায় বলা যায় না। আজ যাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে কাল হয়ত তার কাছে হাত পাততে হতে পারে।
মেয়ের সুখের কথা রেজাউল করিম আহানাফ এর বাসায় গেলেন।
আহানাফ এর বাসা খুব সাধামাটা কোন আভিজাত্যের ছোয়া নেই কিন্তু মনোরম পরিবেশে প্রশান্তির ছোঁয়া আছে। মধ্যবিত্তের বাসায় আর কিছু হোক শান্তিতে অন্তত ঘুমানো যায়।
আহানাফ সালাম দিয়ে রেজাউল করিম কে ড্রয়িং রুমে বসালো।
কিছুক্ষণ বাদে আহানাফ এর মায়ের সাথে অবন্তিকার বাবার দেখা হলো।।
রেজাউল করিম নিরবতা ভেঙ্গে কাশি দিয়ে বললেন,,
বেয়াইন ভালো আছেন??
— হুম ভাইজান ভালো আছি। আপনি??
— আপনাদের দোআ তে ভালো আছি। আমার খুব লজ্জা লাগছে। আপনার সাথে অনেক খারাপ আচরণ করেছি যদি সম্ভব হয় ভাই ভেবে ক্ষমা করে দিবেন। আমি টাকার অহংকারে অন্ধ হয়ে ভালো মন্দ বুঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
— ভাই যদি তার ভুল বুঝতে পেরে বোনের কাছে ক্ষমা চায় বোন কি ক্ষমা না করে থাকতে পারে!! আপনি আপনার জায়গায় ঠিক সবাই চায় তার মেয়ের বড়লোক পরিবারে বিয়ে হোক কিন্তু সব সময় তো টাকা দিয়ে সুখী হওয়া যায় না মনের মিল হিবার ও দরকার আছে।
— আপনি অধম ভাই টারে বাঁচালেন। এখন বুঝতে পারছি আমার মেয়ে যা করেছে একদম ঠিক করেছে। টাকা দয়ে সব সময় সুখ কেনা যায় না। অবন্তিকা এখানে সুখে থাকবে। এরচেয়ে ভালো পরিবার ওর জন্য আর কোথাও পাব না আমি।
— আমরা ও এর থেকে ভালো বউ মা পাব না।
আহানাফ এর মা অবন্তিকার বাবা মিলে আবার বিয়ের তারিখ ঠিক করলেন।
অবন্তিকা আহানাফ চায় না তাদের বিয়েতে ধুমধাম হোক। যতটা সিম্পল ভাবে করা যায় সেভাবে আয়োজন করা হচ্ছে।
বিয়ের কথা শুনার পর থেকে অবন্তিকার মুখে হাসি লেগে আছে।
অনেক সাধনার পরে ভালোবাসার মানুষ কে আপন করে পাবে। এবার আর কোন আতংক নেই লুকিয়ে থাকার ভয় নেই। ভালোবাসার মানুষ কে পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করার সৌভাগ্য সবার থাকে না।
অবন্তিকা কে খুশি দেখে রেজাউল করিমের মনে অন্যরকম শান্তি কাজ করছে। সন্তান ভালো থাকলে মা বাবার আর কি বা চাই!!
.
.
তারেক রাহি কে নানা ভাবে বুঝাচ্ছে এ মুহুর্তে বাচ্চা নিলে ক্যারিয়ার গঠনে সমস্যা হবে। বিয়ের কথা কেউ জানেনা এখন যদি এসব শুনে পরিবার কখনো মেনে নিবে না। তারেকের কোন কথা রাহির বিশ্বাস হচ্ছে না। রাহি তারেক কে বলছে,,
— তুমি আমাকে আম্মুর সাথে কথা বলতে দাও। আম্মু বুঝবে আমার অবস্থা।
রাহির কথা শুনে তারেকের মাথায় রক্ত উঠে গেছে,,
— রাহি তোমাকে অনেক বুঝিয়েছি। আমার পক্ষে মায়ের সাথে কথা বলা সম্ভব না।
— তুমি কি চাও বাচ্চা টা মেরে ফেলি??
— দেখো রাহি বুঝার চেষ্টা করো আমি জানি তোমার কষ্ট হচ্ছে। এ মুহুর্তে বুদ্ধিমানের কাজ হবে এবোরেশন করা। বেঁচে থাকলে বাচ্চা হবে।
— তোমাকে শেষ বারের মত বলে দিচ্ছি তুমি আমার জীবনে থাকো আর না থাকো আমি আমার সন্তান কে এ পৃথিবীর মুখ দেখাবো।
— তোমার যা খুশি কর বাচ্চা রাখলে আমাকে পাবা না বলে দিলাম। কথা টা মাথায় রেখো কিন্তু।
— তোমার মত স্বার্থপর মানুষ কে না পেলেও চলবে।
রাহি কাঁদছে কত না স্বপ্ন ছিলো তারেকের সাথে ছোট্ট একটা সংসার হবে। রাহি জানে বাচ্চা নষ্ট করলেও তারেক ওর জীবনে থাকবে না।।
ভাবী থাকলে আজ সাহস পেতাম। কি অদ্ভুত শাস্তি পাচ্ছি যেখানে একটা বাচ্চার জন্য আমরা তাকে দূর দূর তাড়িয়ে দিলাম সেখানে আজ আমার বাচ্চার কথা কাউকে জানাতে পারছিনা।
.
.
সাইমুন না খেতে খেতে অনেক অসুস্থ হয়ে গেছে। নিজেকে এক ঘরে বেঁধে রেখেছে। আগে যা একটু বারান্দায় যেত এখন সেটাও যায় না। আলো একদম পছন্দ করে না। সাইমুনের মা ছেলের শারীরিক অবস্থা দেখে ঠিক করেছেন ডাঃ দেখাতে নিয়ে যাবেন। এভাবে চলতে থাকলে ছেলেটা কে হারাতে হবে।
.
.
রাশেদ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর না এবার মুনতাহা কে মনের কথা জানাতে হবে। ভালোবাসার বেশিদিন চেপে রাখা যায় না। মুনতাহা যেভাবেই রিয়েক্ট করুক মুনতাহা কে তার ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিবে।
মুনতাহা কে রাশেদ আগে থেকে পছন্দ করত কিন্তু মুনতাহার বিয়ে হয়ে যাওয়াতে সেটা বলে উঠতে পারেনি। জীবন যেহেতু ২ য় বার সুযোগ দিয়েছে রাশেদ সে সুযোগ হারাতে চায় না। ডিভোর্সি মেয়ে কে ভালোবেসে বিয়ে করা যাবে না এমন তো কোন আইণ নেই। বরং ডিভোর্সি মেয়েরা স্বামীকে খুব ভালোবেসে স্বামীর আনুগত্য পালন করে। যে যাই বলুক রাশেদ সকল পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
রাশেদ মুনতাহা কে কল করে ইমারজেন্সি দেখা করতে বলেছে…
….চলবে….