চন্দ্রাবতী আসছে ! Part- 08 ( শেষ পর্ব )
তাই আমি একটা ছুরি নিয়ে নিজের হাতে আঘাত করলাম।ভালোবাসার মানুষের মরে যাওয়া চোখে দেখার চেয়ে নিজে মরে যাওয়া অনেক ভালো।আমি অরন্যকে কখনও হারাতে পারব না আমার আগে।১৫ টা বছর ওর সাথে আমি কাটিয়েছি শুধু মাত্র ভালোবাসার বন্ধনটার জন্য।আর আজকে অরন্যকে সে বন্ধন ছিড়ে যেতে আমি দেখতে পারব না।কিন্তু নিজের হাতে যখন আঘাত করলাম তখন খেয়াল করলাম চন্দ্রাবতী অরন্যকে শূণ্যে থেকে নীচে আঁচড়ে ফেলে আমাকে বলছে
-মা একি করছ তুমি?যতই হোক তুমি আমাকে পেটে নিয়েছ তুমি ও সুখীর মত আমার মা হও।তুমি এভাবে হাতে আঘাত কর না।আমার যে কষ্ট হয়।পেটে থাকতে তোমার সাথে আমি কত কথা বলেছি।আমিও যে তোমাকে ভালোবাসি মা।
চন্দ্রাবতীর কথা শুনে বেশ বুঝতে পারছিলাম আমার মত চন্দ্রাবতীর ও আমার প্রতি একটা মায়া জন্মে গিয়েছে।পাশ থেকে প্রফেসর বিশ্বাস চন্দ্রাবতীর কথা শুনে আমাকে কানে কানে বললেন
-মিসেস অধরা এটাই সময় সবকিছু ঠিক করার।চন্দ্রাবতীকে বুঝাতে পারলেই সুখী শান্ত হয়ে যাবে।আপনি চন্দ্রাবতীকে বুঝানোর চেষ্টা করুন এবং তাদের মুক্তি কিসে হবে সেটার উপায় টা বের করে নিন।
আমি প্রফেসর বিশ্বাসের কথা শুনে।মনে আরও মনোবল বাড়ালাম আর চন্দ্রাবতীকে বললাম
-মা তুমি যে আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন আমার অরন্যকে কেড়ে নিচ্ছ।অরন্য তো তোমাদের সাথে কোন অন্যায় করে নি।তাহলে অরন্যকে কেন কষ্ট দিচ্ছ?অর্জুন এর শাস্তি কেন অরন্যকে দিচ্ছ?অর্জুন তো মরে গিয়েছে আর তার শাস্তি অরন্যকে দিয়ে কি লাভ?
পাশ থেকে সুখী হঠাৎ শান্ত হয়ে চন্দ্রাবতীকে বলল
-চন্দ্রাবতী প্রতিশোধ নে।
চান্দ্রাবতী সুখীর কথার জবাবে বলল
-না মা,তা পারব না।অরন্যকে মারা ছাড়া তুমি আমাদের মুক্তির অন্য উপায় বল।অরন্যকে মেরে আমি অধরাকে কষ্ট দিতে পারব না।আর আমাদের তো হত্যা করেছে অর্জুন তাহলে কেন একজনের শাস্তি আমি অন্যজনকে দিব।তুমি একজন ন্যায় বিচারক রাণী ছিলে তোমার কাছে কি এটা ঠিক মনে হচ্ছে।একবার তোমার সে সততা আর ন্যায় বিচারটা কাজে লাগিয়ে বল।
এবার খেয়াল করলাম সুখী চন্দ্রাবতীর কথাটা শুনে বেশ শান্ত হয়ে গেল।বুঝতে পারলাম সুখীর মনেও প্রশ্নটা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।খানিকক্ষণ ভেবে সুখী উত্তর দিল
-কিন্তু আমাদের মুক্তি ত তখনেই হবে যখন আমরা অর্জুনের বংশধরের রক্ত স্পর্শ করতে পারব।
কথাটা শুনে আমি ঠিক কি করব বুঝতে পারছিলাম না।তবে ছুরিটা দিয়ে অর্জুনের হাতের এক অংশ কেটে বললাম
-রক্ত দরকার তো এই নাও অর্জুনের বংশধরের রক্ত। রক্ত স্পর্শ করলেই তোমরা মুক্তি পেয়ে যাবা।এতে তো অরন্যকে মারার কোন প্রয়োজন দেখছি না।প্লিজ অরন্যকে মের না।
খেয়াল করলাম সুখী এবার সে রক্ত স্পর্শ করেছে আর চন্দ্রাবতীও। সাথে সাথে চারদিকের ঝড় থেমে গিয়েছে।ঘরের কম্পন ও থেমে গিয়েছে।এবার সুখী আমাকে বলল
-তুমি আমাকে মুক্তি দিয়েছ তুমি কি চাও বল?
আমি বললাম
-তুমি আমার জীবন থেকে তোমার অভিশাপটা তুলে নাও।আমি আবার মা হতে চাই।আমি চাই আমার কোলে আবার চন্দ্রাবতী আসুক তবে মানুষ হয়ে।চন্দ্রাবতীকে গর্ভে ধারণ করে তার প্রতি এক অসম্ভব মায়ায় আমি জড়িয়ে গিয়েছি সে মায়া থেকে আমি বের হতে পারছি না।
পাশ থেকে চন্দ্রাবতীও বলে উঠল
-অধরার মায়ের পেটে থেকে আমিও যে মাকে বেশি ভালোবেসে ফেলেছি সুখী মা।আমিও চাই আমি অধরার মেয়ে হয়ে আসি।
সুখী এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল
-তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে অধরা। তোমার গর্ভে চন্দ্রাবতীই আসবে।আর সে সাধারণ মানুষ হয়েই আসবে।কিন্তু তার গুণ হবে অসাধারণ। আমার সব গুণ তার মধ্যে থাকবে।বড় হওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যে গুণগুলো প্রকাশিত হতে থাকে।আর এই নাও এ মুকুটটা।
আমি সুখীর হাত থেকে মুকুট টা নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
-এটা কিসের মুকুট।এটা দিয়ে কি করব আমি।
সুখী একটা দীর্ঘশ্বাস ফলে বলল
-এটা চন্দ্রাবতীর জন্য আমি বানিয়েছিলাম।কিন্তু পড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি।তোমার কোলে জন্ম নিলে তাকে এটা পড়িয়ে দিও।আমি এবার আসছি।
এটা বলার পর খেয়াল করলাম চন্দ্রাবতী মিলিয়ে গিয়েছে আর একটা হাওয়ার মত কিছু একটা ডাক্তার সায়মার শরীর থেকে বের হয়ে গিয়েছে আর ডাক্তার সায়মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।এদিকে অরন্যও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।আমি অরন্যের হাতটা কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলাম।কিছুক্ষণ পর খেয়ালর করলাম দুজনের জ্ঞান ফিরেছে।ডাক্তার সায়মা উঠেই প্রফেসর বিশ্বাসকে বলল
-সুখী কি এসেছিল।
এবার প্রফেসর বিশ্বাস মুচকি হেসে জবাব দিল
-আসার আগেই চলে গিয়েছে।
-মানে।
-মানে কিছু না।সব ঠিক আছে।
আমিও মুচকি হাসলাম।কারন ডাক্তার সায়মা ভুলে গিয়েছে এতক্ষণ তার সাথে কি হয়েছিল।খেয়াল করলাম অরন্য ও আমাকে বলছে
-অধরা ঠিক আছ তো।
আমি শান্ত হয়ে জবাব দিলাম
-ঠিক আছি।
প্রফেসর বিশ্বাসকে বললাম
-আপনাকে ধন্যবাদ সাহায্য করার জন্য।
প্রফেসর বিশ্বাস একটু হেসে বললেন
-শেষটা আমার সাধ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল।আপনি ঠিক না করলে হয়ত ঠিক করতে পারতাম না।
-আপনি আর ডাক্তার সায়মা প্রথম থেকে পাশে না থাকলে আমি তো কিছুই বুঝতাম না।বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।এখন আমরা যায়।
প্রফেসর বিশ্বাস এবার একটু জোরে হাসি দিয়ে বললেন।
-হয়ত কয়েকদিন পরেই দেখা হতে পারে।
আমি বেশ অবাক হয়ে জাবাব দিলাম
-কেন?
ওনি আবারও একটা হাসি দিয়ে বলল
-কারন চন্দ্রাবতী তো আসছেই।
আমি এবার বেশ বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলাম
-আপনি সবসময় বেশ হেয়ালি করেন।
যাইহোক তারপর আমরা সবাই প্রফেসর বিশ্বাসের বাড়ি থেকে প্রস্থান নিলাম।অরন্যের সাথে আমার সম্পর্ক টা আরও ভালো হল।সে ঘটনার তিনমাস পরেই আমি বেশ বমি করতে লাগাম একদিন।কি হল বুঝতে পারছিলাম না।মাথাটা ও একটু ঝিমুনি দিল।পরে কি হল বুঝে উঠার আগেই পরে গেলাম।
জ্ঞান ফিরার পর খেয়াল করলাম ডাক্তার সায়মা আর অরন্য আমার পাশে।আমি অরন্যকে জিজ্ঞেস করলাম
-কি হয়েছে আমার?
অরন্য খুশির কারনে কথা বলতে পারছিল না।কি বলবে হয়ত বুঝতেও পারছিল না।আমাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল।আমিও বুঝতে পারছিলাম না কি হয়েছে।তাই আস্তে করে অরন্যকে বললাম
-ডাক্তার সায়মার সামনে লজ্জা সরম সব খেয়েছ নাকি।এভাবে ধরলে যে।
অরন্য এবার আমার কথা শুনে বেশ লজ্জা পেয়ে আমাকে ছাড়ল।ডাক্তার সায়মা আমাকে বলল
-মিসেস অধরা আপনি মা হতে চলেছেন।
ডাক্তার সায়মার কথাটা শুনে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।কি যে খুশি লাগছিল বুঝতে পারছিলাম না।অরন্যকে বললাম
-তুমি ডাক্তার সায়মাকে খালি মুখে বিদায় করবে নাকি? যাও তাড়াতাড়ি মিষ্টি নিয়ে এস।
অরন্য আমার কথা শুনে দৌঁড়ে মিষ্টি আনতে গেল।ডাক্তার সায়মা বললেন
-আপনার কি মনে হয় আপনার ছেলে সন্তান হবে নাকি মেয়ে সন্তান।
আমি হাসি মুখে জবাব দিলাম
-অবশ্যই মেয়ে সন্তান। আমার কোলে আমার চন্দ্রাবতী আসবে।
ডাক্তার সায়মাও এবার হাসলেন আর বললেন
-আপনার মনের ইচ্ছা যেন পূরণ হয়।
এবার আমার পেটে আমার মেয়ে আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল।সময়ের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে কবে যে আমার মেয়ে ভূমিষ্ঠ হবে আমি সে অপেক্ষায়। দেখতে দেখতে ৮ টা মাস পার করলাম।আল্ট্রা করার পর ডাক্তার সায়মা বললেন আমার মেয়ে সন্তান হবে।আর আমার মনে তো বিশ্বাস ছিলই আমার চন্দ্রাবতীই হবে।
কেটে গেল ১০ টা মাস।হঠাৎ রাতে স্বপ্ন দেখলাম একটা মোমের পুতুল ঠিক স্পর্শ করতেই সেটা মানুষ হয়ে গিয়েছে আর আমার কোলে এসে জড়িয়ে ধরে আছে।এসময় আমার ঘুম ভাঙ্গল আর হুট করে ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করলাম আমার পেটে পেইন হচ্ছে।অরন্য আমাকে এভাবে উঠতে দেখে বলল
-কি হয়েছে?
আমি ব্যাথা নিয়েও হাসি হাসি মুখে উত্তর দিলাম
-আমাকে তাড়তাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাও কারন আমার #চন্দ্রাবতী আসছে।
লেখিকা-শারমিন আঁচল নিপা
(আশা করি গল্পটা সবার ভালো লেগেছে।পরবর্তীতে একটা রোমান্টিক লাভ স্টোরি লিখব ইনশাআল্লাহ।)