আড়ালে ভালোবাসার সংসার

আড়ালে ভালোবাসার সংসার !! Part- 33

বিথী রক্তিম চোখে দিশা ও বিধানের দিকে তাকিয়ে এক ছুটে তাদের কাছে যেয়ে বিধানকে ছিটকে দিশার থেকে ঠাস করে এক চর দেয়। বিধান তো থম ধরে আছে কারণ সে ঘটনার আকস্মিকতায় সে বুঝতেই পারছে না হলোটা কি। একই রকম অবস্থা দিশারও। এদিকে মার্কেটে অবস্থিত সকলেই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। আসলে আমরা বাঙালিরা তো এমনই ফ্রির মুভি কি করে মিস করতে পারি! দিশা দৌড়ে যেয়ে বিধানের কাছে তাতে বিথী আরও রেগে দিশার দিকে হিংস্র হায়নার মতো।

দিশা তা দেখে অবাক হয়ে বলে, ভ-ভাবি কি হয়েছে! এমন করছো কেনো!
বিথী যেনো কথাটা শুনে আরও তেলে বেগুণে জ্বলে উঠে তাই সে দিশার দুই কাধ ধরে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে তাই না! তোর জন্য করছি এসব নষ্ট মেয়ে একটা! লজ্জা করে বাজারের মেয়েদের মতো অন্যের স্বামীর সাথে গা ঘেষতে! তোদের মতো অপয়াদের জন্যই সবার সংসার নষ্ট হয়! তোদের রক্তটাই এমন বুঝলি! অপবিত্র! নষ্ট রক্ত!

ঠাসসসস!
বিধান বিথীর কথা আর সহ্য করতে না পেরে ওর গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হয়। এতে বিথী ছিটকে পড়ে যা দেখে আশা দৌড়ে আসে। এতোক্ষণ সব চুপ করর দেখলেও আর চুপ থাকতে পারলো না তারা। আশা ও আরিশা মিলে বিথীকে তুলে দাঁড় করায়।

বিধান বিথীকে ধরতে আসলে আশা তাকে থামিয়ে বলে, এখন কেনো আসছো ঐ মেয়ের জন্য তো আমার বোনকে মারলেই তো ওকে নিয়েই থাকো। আমি বিথীকে এখানে আসার দিনই বলেছিলাম যে এই মেয়েকে আমার সুবিধার লাগে না……….আমি তো জানতাম এসব বিদেশে বড় হওয়া মডার্ন নষ্টা মেয়েরা অন্যের স্বামীর গলায় ঝুলার পরিকল্পনাই থেকে আর হলোও তাই!
আয়ান এসব শুনে বলে, আহহ আশা চুপ করো তো! রাস্তায় আ….!
আর বলতে পারলো না আরিশা আয়ানকে থামিয়ে বললো, জিজু তুমি আশাপুকে থামাচ্ছো কেনো ঠিকই তো বলছে! এই মেয়ের জন্যই বিথীর সংসারটা ভাঙলো! বিথী ঠিকই বলেছে রক্তই ভালো না এসব মেয়ের!
আশা দিশার দু কাধ ধরে ঝাঁকিয়ে বললো, এই মেয়ে এবার তোর শান্তি হয়েছে তো আমার সরল-সোজা বোনটার সংসার মেনে। নাহ তোর শান্তি হবে কি করে তোদের তো আবার চরিত্রের ঠিক নেই আজ এর স্বামী পছন্দ তো কাল ওর!

দিশা আর সহ্য করতে না পেরে আশাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পাগলের মতো দৌড়িয়ে রাস্তার দিকে যেতে থাকে বিধান তা দেখে ভয় পেয়ে দিশার পিছন পিছন দৌড়ায়।
বিধানঃ দিশুউউউউ! আমার কথা শুন দিশু!
দিশাঃ আ-আমি ন-নষ্টা না! আম-ই না!
দিশা এসব বলে চিৎকার করে দৌড়ে যাচ্ছিলো ঠিক তখনই একটা বাস প্রচণ্ড গতিতে এসে তাকে ধাক্কা দেয়। দিশার শরীরটা ছিটকে পড়ে রাস্তার পাশে।
বিধান এসব দেখে চিৎকার করে উঠে, দিশুউউউ!

তারপর দৌড়ে যেয়ে দিশার মাথাটা নিজের কোলে রাখে। দিশার শরীর থেকে রক্ত বয়ে রাস্তাসহ বিধানের শরীরটাও রক্তিম হয়ে যাচ্ছে।
বিধান বোনের মুখ থেকে রক্ত সরিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে বলে, দিশু বোন আমার চোখ খুল! বোন আজই তোকে নিয়ে শপিংয়ে যাবো! চোখ খুল!
দিশা পিটপিট করে চোখ খুলে বিড়বিড় করে বলে, আ-আমি ন-নষ্টা নই। ব-বিশ্বাস ক-কর আমার র-রক্ত খাআরাপ ন-নয়।

বলতে বলতেই জ্ঞান হারালো যা দেখে বিধান দিশাকে বুকে নিয়ে পাগলের মতো কাঁদতে লাগলো। এদিকে নীলাভ্র এক্সিডেন্ট হওয়ার সাথে সাথেই এম্বুলেন্সে কল করেছিলো তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দিশাকে নিয়ে গেলো। দিশার সাথে বিধানও এম্বুলেন্সে করে গেলো। ঘটনার আকষ্মিকতায় নীলাভ্রসহ আরিশা, আশা, দিপ্ত ও আয়ান সকলেই অবাক। বিশেষ করে বিথী তো থম ধরে আছে এবং মনে মনে একটাই কথা বলছে, কোনো ভুল করে ফেলিনি তো!

হসপিটালে নিতেই ডাক্তার জানালো দিশার অবস্থা বেশি ভালো না। অনেক ব্লাড বের হয়ে গিয়েছে শরীর থেকে ইঞ্জুরি গুলোও খুব গভীর।
বিধান উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমার দিশু সুস্থ হয়ে যাবে তো আগের মতো!
ডাক্তার বিনীত গলায় বললো, দেখুন পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিকাল……..অপারেশন সাকসেসফুল হওয়ার চান্সও মাত্র ১০%। আর সাক্সেসফুল হলেও বাঁচবে কিনা…….
আর বলতে দিলো না বিধান তার আগেই ডাক্তারের কলার ধরে রাগী কণ্ঠে বললো, দেখ ডক্টোর যতো টাকা লাগে আমি দিবো কিন্তু আমার বোনকে আমার সুস্থ চাই নাহলে আমি সব শেষ করে দিবো।

এমন সময়ই আসলো বিথীরা আর নীলাভ্র, আয়ান ও দীপ্ত ছুটে যেয়ে বিধানকে ছাড়াল। ডাক্তারে হাফ ছেড়ে বেঁচে স্থান ত্যাগ করলো।
আয়ান বিধানকে শান্ত করার জন্য বললো, বিধান সব ঠিক হয়ে যাবো! মাথা ঠাণ্ডা করো!
বিধান ভাঙা গলায় বললো, কি করে ঠাণ্ডা হবো বলো আমার বোনটা সারা জীবন কষ্টই পেয়ে আসলো! বাবা নিজের ভাইয়ের কোল ভরার জন্য কাউকে না জানিয়ে ছোট্ট একদিনের দিশুটাকে চাচ্চুকে দিলো। কিন্তু চাচি দিশুকে মেনে নেয়া তো দূরে থাক দুই চোখের কাটা মনে করতো কারণ চাচ্চু বলেছিলো বাচ্চাটা কুড়িয়ে পেয়েছে…….যা নয় তাই বলে গালিগালাজ করতো……….সবসময় তো জারজ-অপবিত্র বলতোই।
(বলে একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো) ইউএসএতে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে একা একা, অবহেলায়, অনাদরে। মাঝে মাঝে যখন বাংলাদেশে বেড়াতে আসতো জানো আম্মুর, আমার ভালোবাসা পেয়ে মেয়েটা এতো খুশি হতো…….যেতো চাইতো না বলে চাচ্চু জোড় করে নিয়ে যেতো! দুই বছর আগে যখন ইউএস গিয়েছিলাম তখন চাচ্চু আমাকে জানায় ওই-ই আমার বোন………কিন্তু ওকেসহ কাউকে জানাতে মানা করে। মেয়েটার হাসির মাঝে লুকিয়ে থাকা কষ্ট না আমি তার সাথে ইউএসএতে একটা বছর থেকে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম কিন্তু নিজের কাছে আনতে পারিনি ওর স্টাডির জন্য। জানো আমার দিশুটা না অনেক আশা নিয়ে বাংলাদেশ এসেছিলো যে এখন তার সুখের দিন আসবে কিন্তু………….

★(বিঃদ্রঃ ‘ডোন্ট জাজ আ বুক বাই ইটস কাভার’এই জনপ্রিয় উক্তিটি আমরা সকলেই হয়তো জানি কিন্তু আসলেই কি মানি! নাহ বাঙালিরা তো অবশ্যই মানে না। রাস্তায় দুজন সমবয়সী ছেলেমেয়েকে দেখলেই কটুবাক্য বলে উঠি, কিন্তু আমরা কি আসলেই জানি তাদের সম্পর্ক? যদি দুজন ভিন্ন লিঙ্গের কাজিন একসাথে হাসাহাসি করে বা কথা বলে বা একটু গায়ে হাত দেয় তাহলে তাদের মধ্যে কিছু চলছে, কিন্তু আমরা কি আসলেই জানি? নাহ আমরা জানি না! তারা তো ভাইবোন বা ভাই-বোনের মতো হতে পারে, তারা ভাই-বোনের থেকে আপন হতে পারে, ভালো বন্ধু এমনকি স্বামী-স্ত্রীসহ আপনি যা ভাবছেন সেটাও হতে পারে। আমরা তো সঠিক তথ্য জানি না কিন্তু আমাদেরকে তো সমাজ বিচারক করে রেখেছে তাই আমাদের তাদের দেখে একটা না একটা উক্তি দিতেই হবে। ভুললে চলবে না আপাত দৃষ্টিতে আমরা যা দেখি তা সত্যের চেয়ে মিথ্যাই বেশি। যেমন টুডিতে কোনো বস্তু আর থ্রিডিতে কোনো বস্তুর মধ্যে অনেক পার্থক্য। মনে সন্দেহ ও কৌতূহল আসবেই কারণ মানব মনটাই এমন তাই বলে আমরা উত্তরের প্রকৃতির ভয়ে প্রশ্ন না করে সন্দেহকে আশ্রয় দিলে পরিণাম এতোটাই ভয়ংকর হয় যে যেটা রক্ষা করার জন্য আমরা প্রশ্ন করে না সেটাই ভেঙে টুকরা হয়ে যায়। বিথী কিন্তু একই কাজ করেছে সে চুপ।থাকাকেই বেছে সে যদি বিধানকে প্রশ্ন করতো তাহলে সমস্যাটা এতো দূর যেতো না। বিধান কিন্তু কখনো দিশার সাথে এমন আচারণ করেনি যা বিথীর সাথে করে। হ্যাঁ বিধান বিথী-দিশা উভয়কেই আগলে রাখতো, কাউকেই একা ছাড়তো না কারণ একটা ছেলে তার মা, স্ত্রী ও বোনকে নিজের ছায়াতলে আগলে রাখতো এবং বিথী দিশা-বিধানের খুনিশুটি দেখার সময় এটাও ভুলে গিয়েছিলো যে তা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নয় ভাইবোন বা বন্ধুদের মাঝেও হয়। যেমনটা দিপ্ত ও বিথীর সম্পর্কই)★

আর বলতে পারলো না গলাটা কেমন যেনো ধরে আসছে। এদিকে হসপিটালের করিডোরের এককোণায় দাঁড়িয়ে আছে বিথী, আশা ও আরিশা। বিধানের কথা শুনেই তারা সকলেই অনুতপ্ত। বিথীর তো মাথাটা সম্পূর্ণ ভোঁ ভোঁ করছে।

থীবি কাঁদতে কাঁদতে মনে মনে বললো, হায় আল্লাহ! এটা আমি কি করে ফেলেছি ভুল বুঝে……এতো বড় অপরাধ না না পাপ কি করে ফেললাম! একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের চরিত্রে……… কি করে পারলাম আমি! বিধান কি আমাকে কখনো মাফ করবে আর দিশা…….. আমার জন্য একজন মানুষ বাঁচা মরার মাঝে অবস্থান করছে………

বিধান আয়ানের কাছ থেকে সরে এসে আইসিইউ এর সামনে পায়চারি করছিলো ঠিক তখনই ওর চোখ পড়ে করিডোরের এক কোণে সেখানে বিথীকে দেখে বিধানের মনে আগুন জ্বল্ব যায়। সে মুখ শক্ত কিরে রক্ত চোখ নিয়ে বাঘের মতো তেড়ে আসে বিথীর দিকে। বিথী তখন নিজ ভাবনায় ব্যস্ত হয়ে ঢুকরে কাঁদছে কিন্তু আজ বিধানের সেসবে ভাবান্তর হলো না।

বিধান এক টানে বিথীকে নিজের সামনে এনে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেনো এসেছিস তুই আমার দিশু মরে গিয়েছে না বেঁচে আছে তা দেখতে! কালনাগিনী কোথাকার! তোর জন্য কি কি করি নাই……….নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসছি! যদি জানতাম তোকে ভালোবাসা আমার বোনটার কাল হবে কবেই নিজের ভালোবাসাকে গলা টিপে মেরে ফেলতাম! কান খুলে শুনে রাখ যদি আমার বোনের কিছু হয় না ভালোবাসি বলে তোকেও ছাড় দিবো না সব শেষ করে দিবো সব! তোর আর আমার সম্পর্ক ভুলতেও পিছ পা হবো না মনে রাখিস!

বলে বিধান বিথীক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো কিন্তু কেউ কিছু বললো না। আসলে বলার ভাষাই পাচ্ছে না কোনো। বিধানের কথায় বিথীর মন অজানা ভয়ে কেঁদে উঠলো এবং মনে মনে ভাবলো, আসলেই কি সব শেষ হতে চলেছে! অন্ত হতে চলেছে ওদের এই আড়ালে ভালোবাসার সংসারের!
ডাক্তার কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে বলল, রক্ত লাগবে রোগীর! বি পজেটিভ কেউ আছেন?
দিপ্ত বলে উঠলো, আমার রক্ত বি পজেটিভ আমি দিবো।
ডাক্তার নার্সকে রক্ত নিতে বলে চলে গেলো

প্রায় আধা ঘন্টা আইসিইউ থেকে অপারেশন শেষ করে ডাক্তার বের হলো। বিধান তার সামনে এসে জেরা করতেই সে বলে উঠলো, দেখুন স্যার আমাদের হাতে যতটুকু আমরা তা করেছি বাকিটুকু আল্লাহর ইচ্ছে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে কিছু বলা যাচ্ছে না।
কথাটা শুনেই বিধান ছুটলে হসপিটালে থাকা নামাজ ঘরের দিকে। মনে মনে বললো, আল্লাহ তোমার কাছে হাত পাতছি ফিরিয়ে দিয়ো না তোমার অসহায় বান্দাকে।

চলবে,,,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *