আড়ালে ভালোবাসার সংসার !! Part- 32
রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বিথী হঠাৎ এক গগনবিদারী চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে উঠে। বিধানও বিথীর এমন আচমকা চিৎকারে এক লাফে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। বিথীর দিকে তাকিয়ে দেখে সে কাপছে আর কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছে। সে বুঝতে পারে বিথী কোন খারা স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছে। তাই সে বিথীকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করা।
বিথী বিধানের ছোঁয়া পেয়ে তাকে শক্ত করে আকরে ধরে বলতে থাকে, বিধান প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন না! আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি! মর……
বিধান বিথীর ঠোঁট জোড়া নিজের তর্জনী আঙুল দিয়ে চেপে ধরে রাগী কণ্ঠে বলে, কি আজেবাজে কথা বলছো…….আরেকবার মরার কথা মুখে আনার চেষ্টা করলো জিভ ছিঁড়ে ফেলবো!
বিথী বিধানের রাগী কণ্ঠে আরও ভয় পেয়ে উত্তেজিত হয়ে বললো, আই প্রমিজ কখনো এই কথা বলবো না! প্লিজ আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন না!
বিধান বিথীর কথায় বুঝতে পারে তার রাগে বিথী আরও ভয় পাচ্ছে তাই চোখ বন্ধ করে কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মাথা ঠান্ডা করে। তারপর বিথীর মাথাটা উঠিয়ে কপালে চুমু খেয়ে নিজের বুকের হৃদপিণ্ড যে পাশে সেখানে চেপে ধরে।
বিধানঃ দেখো তো তুমি কোথায়? আমার বুকে, বিধানের বুকে! বিধানের বুকেই বিথীর ঠিকানা……আর বিধানের ঠিকানা বিথীর মাঝে! মানুষ কি নিজের ঠিকানা ভুলতে কিংবা ছাড়তে পারে! তাহলে তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
বিথীঃ সত্যি আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো!
বিধানঃ শোনো পাখি সারা বিশ্ব ঘুরলেও সবশেষে তারা নিজ নীড়েই ফিরে আসে। কারণ সে ঐ নীড়েরই পাখি বাকি দুনিয়ার জন্য সে শুধুই অতিথি পাখি……ঠিক তেমনই বিধান চৌধুরীর নীড় এই বিথী চৌধুরী সে দিনশেষে এই নীড়ের মাঝেই এসে মিশবে যদি কখনো না আসে ভেবে নিবে সে আর এই দুনিয়াতেই ন……
আর বলতে দিলো না বিধানকে বিথী। গলায় দুই হাত পেঁচিয়ে শক্ত করে আকরে ধরলো বিধানকে যেনো ছাড়লেই হারিয়ে যাবে কিছুক্ষণ পর মুখ উঠিয়ে বিধানের দিকে তাকালো।
বিথীঃ বিধান প্লিজ এসব বলবেন না! ঐদিন আসার আগে যেনো আমিই……..(আর কিছু বললো না বিধানের চোখ রাঙানো দেখে শুধু কাঁদতে কাঁদতে বললো) বড্ড ভালোবাসি আপনাকে মেনে নিতে পারবোনা যে!
বিধানঃ আমিও বড্ড ভালোবাসি আমার বিথী পাখিকে। (বলে বিথীর চোখ জোড়া মুছে দিলো)
বিথী নিশ্চুপ হয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে লাল নীল হচ্ছে। তবে গলা তখনো অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে আছে তাই বিধান গলায় মুখ ডুবিয়ে নিজের গাল দিয়ে ঘষে তা নিজের মাঝে মিশিয়ে নিলো।
বিধানঃ তা এখন বলেন কাঁদছিলেন কেনো? কি হয়েছিলো?
বিথী মনে মনে বললো, উনাকে বলবো যে কি দেখেছি……..কি করে বলবো যদি উনি কষ্ট পায়! না! না! বিধানকে বলার দরকার নেই………..কিন্তু বিষয়টাতে পরিষ্কার নাহলে তো সন্দেহ থেকে যাবে! সামনাসামনিই বলি………উনি রাগ করলে!
বিথী আসলে স্বপনে দেখেছে সে আর বিধান একটা সুন্দর বাগানে হাঁটছিলো। হঠাৎ করে বিধানকে দিশা তার থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায় এবং তার সামনেই এই দুজন মানুষ হাওয়ায় মিশে যায়। ঠিক তখনই বিথী চিৎকার করে জেগে উঠে। বিথী এখন গ্রাস হচ্ছে দ্বিধা, সংকোচ, ভয়, সন্দেহের বেড়াজালে। বিধানকে বলবে কিনা দিশা ও তার সম্পর্ককে স্বচ্ছ করতে। একসময় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো সে কিছু বলবে না!
(বিঃদ্রঃ মানুষ অনেক সময় এমন দ্বিধা-দন্দে পড়ে তবে তারা সহজ দিকটাই গ্রহণ করে। ঠিক যেমন বিথী করেছে বিধান-দিশার সম্পর্কের ব্যপারে। আমরা সত্যটাকে গ্রহণ করতে ভয় পাই……ভয় থাকে নিষ্ঠুর সত্যতার মুখোমুখি হতে। যদি মুখোমুখি হলে সত্যটা আমাদের বিপরীত হয় অথবা আমাদের জন্য কল্যাণকর না হয়। তাই আমরা সাধারণত মিথ্যেতেই বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নেই…..কারণ .প্রশ্ন করে কঠোর সত্যর মুখোমুখি হওয়ার থেকে বা কাঙ্ক্ষিত উত্তরের বাইরে অথবা নিজের বিপক্ষে উত্তর পাওয়া থেকে এটাতেই আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যার ফলে আমাদের মধ্যে উত্তর নিয়ে থাকা সন্দেহ আমাদের ভিতরটা পুড়িয়ে দিতে থাকে। অদ্ভুত না যেখানে একটা প্রশ্ন সব ঠিক করতে পারে সেখানে চুপ থেকে নিজের অন্তরটাকেই দূষিত করে ফেলি……শেষ পর্যন্ত সংসারটাও নষ্ট হয়ে যায় সংশয়ের গ্রাসে)
বিথী প্রায় অনেক্ষণ ধরে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছে কিন্তু কিছু বলছে না দেখে বিধান বিথীকে কিছুটা ঝাকিয়ে ডাক দেয়।
ইধানঃ বিথীইইইই!
বিথীঃ ক-কী?
বিধানঃ এতো কি ভাবছো! আর বললে না কি জন্য এমন চিৎকার দিয়ে উঠলো!
বিথী কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। তাই আমতা আমতা করে বললো, বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম তো আপনাকে নিয়ে তাই একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম!
বিধানঃ ওহ! অবশ্য আমি এটাই ভেবেছিলাম……কি দেখেছিলে!
বিথীঃ বলা যাবে না! কারণ দুঃস্বপ্ন কাউকে বললে তা সত্যি হয়!
ধানবিঃ ওহ আচ্ছা! (গোমড়া মুখো)
বিথীঃ চলেন এখন ঘুমোই আবার!
বিধানঃ এখন আবার কিসের ঘুম! অনেক ঘুমিয়েছেন ম্যাডাম……..নাও নো ঘুম অনলি রোমেন্স!
বিথীঃ ধুরররর! কি বলছেন ঘুমোন তো।
বিথীর কথায় বিধান একটা ডেভিল হাসি দেয়। কারণ সে কি আর শুনবে বিথীর কথা! বিথীকে নিয়ে পাড়ি জমালো ভালোবাসার অথৈ সাগরে।
সকাল দশটায় বিধানের ঘুম ভাঙে তবে আজ এক ফালি রোদের জন্য নয় চোখেমুখে পানির ছিটে পেয়ে। মিটমিট করে চোখ খুলে সামনে তাকাতেই চোখে মুগ্ধতার শীতল ছায়া নেমে আসে কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঝাড়ছে এক অপরূপা বাঙালি গৃহিণী যে কিনা তারই স্ত্রী। বিথী আজ একহাতে সিলভার চুড়ি অন্যহাতে বিয়ের মোটা চুড়ি জোড়া, কানে বড় আকারের সিলভার ঝুমকো, নাকে বিয়ের নাকফুলটা জ্বলজ্বল করছে, গলায় বিধানের দেয়া পেন্ডেন্টের, আঙুলে বিয়ের আঙটি, চোখ জোড়ে কাজলে রাঙিয়ে নিয়েছে, আর মুখে একটু মস্টোরাইজার ও ফেস পাউডার ব্যাস তৈরি সে। বিধান ভালোমতো খেয়াল করে দেখে এটা বিধানের আনা সেই শাড়িটাই।
তাই বিধান মনে মনে ভাবে, এই শাড়িটা কোথায় পেলো! আমার যতটুকু মনে আছে গতকাল তো বিথী এই শাড়ি দিশা থেকে চেয়ে নেয়নি……..আর আমিও বলিনি কারণ এতে সে দিশার কাছে ছোট হতো! নিজের স্ত্রীকে কি করো ছোট করবো তাই আমিও আর কিছুই বলিনি! তবে শাড়িটা…….. যাক নিয়ে এসেছে ভালো এখন এসব বাদ দে বিধান!
মনে মনে নিজের সাথে কথা বলে সে ধীর পায়ে বিথীর দিকে এগুলো আর বিথীর তো কোনোদিকে খেয়াল নেই সে গুনগুন করে গান গাইছে আর চুল মুছচ্ছে তোয়ালে দিয়ে। হঠাৎ কেউ ঝাপটে ধরায় সে ভয় পেয়ে তবেখানিক পরেই তার ভয় কেটে যায় কারণ সে চিনে এই স্পর্শ কার………..সে জানে এটা তার ভালোবাসার মানুষ! মুহূর্তেই রেগে গেলো সে কারণ এই মানুষটার জন্য সে ফজরের নামাযটাও পড়তে পারেনি কাযা পড়তে হবে এখন।
তাই বিধানের পেটে কনুই দিয়ে এক খোঁচা দিয়ে বললো, কি সমস্যা?
বিধান বিথীকে ছেড়ে পেটের খোঁচা দেয়া জায়গায় হাত বুলিয়ে বলে, আহহ! বিথী লেগেছে তো আমার!
বিথী ভেঙচি কেটে বললো, তো এমন করলেন কেনো!
বিধান দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো, তোমার জন্যই তো হলো! তুমি এমন সাতসকাল সেজে আমার সামনে ঘুর ঘুর করবে আর আমি একটু ছুলেই দোষ!
বিথী চরম বিরক্ত হয়ে বললো, ধুরররর!
বিধান হালকা হেসে বললো, আচ্ছা বাজে কথা রাখো………বলো শাড়ি কোথায় পেলে!
বিথী গোমড়ামুখ করে বলে, সকালে দিশা আপুকে ম্যাসেজ করেছিলাম……..মুখে তো ফেরত চাওয়া যায় না তাই!
বিধান হালকা হেসে বললো, কি ম্যাসেজ দিয়েছেন শুনি!
বিথী নিজের ফোনটা বিধানের হাতে দেয় বিধানকে দেখার জন্য কি বলেছে।
ম্যাসেজ-
আপু আসলে কাল যে শাড়িটা দিয়েছিলাম ওইটা আপনার না আমার জন্য আনা। দুটো শাড়ি এনেছিলো উনি আপনার আর আমার জন্য পছন্দ করে কিন্তু বক্সে উনি নাম উলটা পালটা লিখেছে……..এখন উনি নিজের দোষ সিকার না করে আমার সাথেই চেঁচামেচি করছে তাই যদি দিয়ে যেতেন……আর আপনার শাড়িটা বাসায় রেখে আসছি ভুলে রেখে আসছি।
বিধান ম্যাসেজটা পড়ে বিথীর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, আমি তোমার সাথে বিনা দোষে চেঁচামেচি করলাম কখন! তুমি আমার নামে মিথ্যে অপবাদ দিতে পারলে!
বিথী মাথা ঘুরিয়ে বললো, এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।
কিছুক্ষণ পর সবাই ব্রেকফাস্ট করতে নিচে নামলো বেশ লেটই সবাই কারণ গতকালের ভ্রমনযাত্রা। ব্রেকফাস্টের সময় আবার বিথীর মধ্যে সেই স্বপ্নের ভয় কাজ করছে কারণ বিধান বিথীকে যেমন প্লেটু খাবার তুলে দিচ্ছে বা শাসন করে খাওয়াচ্ছে দিশাকেও তাই করছে। আশা-আরিশারও বিষয়গুলো চোখে লাগছে কারণ তাদের মনে হচ্ছে একটা মেয়ের প্রতি বিধানের কি এতো টান যে ভালোবাসার মানুষের মতো আগলে রাখছে। সে যাই হোক তারা ব্রেকফাস্ট শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলো যে এখন তারা কাছের বিচেই ঘুরবে ও গোসল করবে যেহেতু ব্রেকফাস্টেই দেড়টা বেজে গিয়েছে তাই। তারপর বিকাল চারটাবা পাঁচটার দিকে লাঞ্চ করবে কারণ দুপুরে আর খেতে পারবে না এই সময়ে ব্রেকফাস্ট করে।
আশাঃ আচ্ছা বিকেলে কোথায় যাচ্ছো?
আয়ানঃ তা তো ডিসাইড করা হয়নি! দাঁড়াও বিকেলে যাওয়া যায়……..
আশাঃ শপিংয়ে………বিকালে আমরা শপিংয়ে যাবো!
আয়ানঃ হোয়াট এখানেও শপিং!
আরিশাঃ ইয়েসসস! আমি আচার কিনবো এতোগুলো!
আশাঃ হ্যাঁ শপিংয়েই যাবো মিস্টার আয়ান! আপনিও যাবেন সবাই যাবে তাই না বিথী!
আশার কথায় বিথী কোনো উত্তর দিলো না কারণ সে প্রশ্নটাই শুনে নাই। সে যে অন্য চিন্তার গভীর সাগরে সাঁতরাতে বড্ড ব্যস্ত।
আশার কথার উত্তর না পাওয়ায় সে বিথীর দিকে তাকিয়ে দেখে বিথী ভাবনায় ব্যস্ত এবং চেহারাটাও বিষণ্ণ ও চিন্তিত লাগছে।
তাই বিথীর কাধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, কিরে কি এতো ভাবছিস!
থীবি হচকচিয়ে উঠে বলে, ক-কিছু ন-না তো!
আশা মৃদু হেসে বলে, তাহলে এমন বিষণ্ণ লাগছে কেনো?
বিথী আমতা আমতা করে বলে, এমনেই আর কি! একটু হেডেক তো তাই হয়তো!
শাআ বুঝতে পারে বিথী তার থেকে কিছু লুকানোর চেষ্টা করছে বিষয়টা কি সে সম্পূর্ণ বুঝতে না পারলেও তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে বিষয়টা দিশা ও বিধানকে নিয়ে।
তাই কিছুটা অস্পষ্ট ধারণা নিয়েই বলে উঠলো, কিছু না হলেই ভালো। তবে মনে রাখিস, সময় থাকতেই নিজ জিনিসকে নিজের করে রাখতে হয় তা নাহলে নিজের প্রাণ পাখি কখন যে অন্যের খাঁচাবন্দী হয়ে যায় সেটাও বোঝা যায় না। (বলে আশা সেখান থেকে চলে গেলো)
দুপুর, বিচে দিশা এদিল ওদিক ছুটছে আর বিধান তাকে বারবার যেয়ে থামাচ্ছে। বিথী এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে এবং একদৃষ্টিতে বিধান ও দিশার খুনিশুটি দেখছে। দেখছে না বলতে গেলে বিথী তাদের আচারণ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করছে তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে। এমন সময় তার পাশে এসে দাঁড়ালো নীলাভ্র।
নীলাভ্রঃ কি দেখছো!
বিথীঃ বোঝার চেষ্টা করছি! (ঘোরে)
নীলাভ্রঃ মানে?
বিথীর এবার জ্ঞান হলো সে কি বলছে এবং কিছুটা হচকচিয়েও গেলো যা নীলাভ্র স্পষ্ট বুঝে ফেলল তাই বিথীর দিকে ভ্রু কুচকে তাকালে বিথী মৃদু হাসে।
বিথীঃ বোঝার চেষ্টা করছি এই প্রকৃতিকে! এই গভীর সমুদ্রকে! সেটা কি পবিত্র ভালোবাসার চেয়েও গভীর!
নীলাভ্রঃ এখনও বদলাওনি প্রকৃতির কাছে আসলেই আগের মতোই ফিলোসফি বলো!
বিথীঃ আল্লাহর কুদরতই এতো প্রশংসনীয়………..মাধুর্যযুক্ত!
নীলাভ্রকে দেখে বিধান এগিয়ে আসে যা দেখে বিথী মনে মনে বলে, তোমার ফুলের কাছে তুমি অন্য ভ্রমর সহ্য করতে পারো না তাহলে আমি কি করে পারবো!
এরপর সবাই একটু দূরে থাকা জায়গায় যাবে বাইক রাইডিং করতে। এখন সমস্যা হলো সবাই কপত-কপতি বাইকে উঠবে কিন্তু দিশা তো একা আর বিধান দিশাকে কিছুতেই একা রেখে যাবে না। আশা এতে চরম বিরক্ত হলো কারণ এতো আগলে রাখার কি আছে মেয়েটা বিধানের সম্পর্কে এমন কিই বা হয় সামান্য কাজিন। তাই সে কিছুটা হিসাব কষে পরিকল্পনা করে নিলো বিধানকে নিয়ে যাওয়ার।
শাআঃ বিধান ওকে এখানেই রেখে যাও নীলাভ্রও তো যাচ্ছে না!
বিধানঃ কিন্তু……..
আশাঃ আরে বাবা আয়াশাকেও তো রেখে যাচ্ছি। দিশা ওদের সাথে এখানে ঘুরবেনে…….তুমি চলো তো!
দিশাঃ হ্যাঁ বিধু তুই যা!
বিধানঃ আচ্ছা চলো তাহলে!
বিধানরা চলে গেলো এদিকে ভিড়ও কমে এসেছে। দিশা আয়াশাকে নিয়ে পানিতে হাঁটছে এবং নীলাভ্র কিছুটা দূরে বসে তাদের দেখছে। তবে এখন আর সেই আগের হাসি-খুশি দিশা নেই। এই দিশাটাকে বড্ড একা ও ছন্নছাড়া লাগছে নীলাভ্রের কাছে। হঠাৎ আয়াশা নীলাভ্রকে টেনে নিয়ে আসলো কোলে চড়বে বলে। বাচ্চাদের মতিগতি কখন কোনোদিকে যায় বলা মুশকিল।
নীলাভ্র দিশার পাশে দাঁড়াতেই দিশা নীলের দিকে না তাকিয়েই বলে উঠলো, আপনি কি সবসময়ই এমন চুপচাপ থাকেন! নিরামিষের মতো!
নীলাভ্র দিশার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, হ্যাঁ…….আপনার মতো প্রাণোচ্ছল থাকার মতো সুখ নেই তো মনে তাই!
দিশা মৃদু হাসলো নীলাভ্রের কথায় যদিও তা নীলের দিকে তাকিয়ে নয় তবে নীলাভ্রের চোখে ফাঁকি পড়লো না কারণ নীল তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এর মধ্যেই বিধান ম্যাসেজ করে হোটেলে ফিরে যেতে কারণ তারা ডিরেক্ট সেখানে যাচ্ছে।
দিশা নীলাভ্রকে ম্যাসেজটা দেখিয়ে হোটলেরদিকে যেতে যেতে হঠাএ বিলে উঠলো, অনেক সময় বইয়ের কভারের ছবিটা যত রঙিন, সুন্দর ও প্রাণোচ্ছল হয় ভিতরের কাহিনীটা তার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি দুঃখ ও কষ্টের হয়। যা কভারের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।
সন্ধ্যা, সকলেই হোটলে ফিরে এসেছে যদিও বীচ থেকে বার্মিজ মার্কেটে যাওয়ার কথা ছিলো তবে সবাই ভিষণ ক্লান্ত থাকায় আর যাওয়া হয়নি। তবে যদি সবার শরীর সায় দেয় তাহলে রাতে যাওয়ার কথা আছে। বিথী অর্ধ ভিজে যাওয়া কাপড় শরীরে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কারণ বিধান রুমের চাবি হারিয়ে ফেলেছে তাই রুমের বাহিরেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে তার।
প্রায় অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও বিধান আসছে না দেখে অনেক বিরক্তি লাগছে বিথীর। তার উপর দু রুম পরেই থাকা সমবয়সী ছেলেটা বিথীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যার কারণে বিরক্তির সাথে প্রচণ্ড অস্বস্তিও লাগছে। এছাড়াও তো মনে বিধান ও দিশাকে নিয়ে কাজ করা সন্দেহ তো প্রতিমুহূর্তেই তাকে ভিতরে ভিতরে পোড়াচ্ছে। প্রায় অনেক্ষণ পর বিথী দেখলো বিধান আসছে তার পাশেই দিশা অবস্থান করছে। তাদের অঙ্গভঙ্গিমায় মনে করছে দুজনে কোনো বিষয় নিয়ে জমিয়ে হাসিতামাশা করছে যা দেখে বিথীর মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো। ঐ ছেলেটার দিকেই চোখ যেতেই দেখলো সে দিশা ও বিধানকে এক সাথে দেখে কেমন যেনো একটা তৃপ্তির হাসি দিচ্ছে।
বিধান আসতেই বিথীকে বলে উঠলো, এই যে বিথী চাবি নিয়ে এসে পড়েছি……..চলো রুমে যাই!
বিথী মুখ ঘুরিয়ে একটু গম্ভীর সুরে বলে উঠলো, এতো দেরি হলো যে!
বিধানের বিথী গলার স্বরটা একটু অন্যরকম লাগলেও ততটা গুরুত্ব দিলো না। হাসতে হাসতে বলে উঠলো, আর বলো না দিশু নিজের পাসপোর্ট ফেলে এসেছিলো রিসিপশনে। নিচে যেয়ে দেখলাম তন্য তন্য করে কি যেনো খুঁজছে……..বললো পাসপোর্ট তাই আমি ভাবলাম বিচে ফেলে আসছে কিন্তু ও বললো না সে সেখানে নেয়নি। আমিও তার সাথে হোটলে খুঁজতে লাগলাম তবে গাধাটার কিছুক্ষণ আগে মনে পড়ছে সে পাসপোর্ট বাসা থেকে আনেইনি!
বিথী আবারও গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো, ওহ।
ততক্ষণে দিশা নিজের রুমে চলে গিয়েছে। আর বিথী বিধান হাসির সৌজন্যতা রক্ষার্থের হাসলো না বরং বিধানের হাত থেকে কোনোরকম চাবিটা নিয়ে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে গেট খুলে আলমারি থেকে না দেখেই একটা জামা নিয়ে বাথরুমে ছুটলে। বিধান তো ঘটনার আকষ্মিকতায় একদম হা হয়ে গেলো যার কারণে সে তখনও রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
সে যাই হোক কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে স্বাভাবিক করে ভাবতে লাগলো, বিথী এমন করছে কেনো! ওর কি কোনো কিছু হয়েছে নাকি আমিই বেশি ভাবছি! আমিই হয়তো বেশি ভাবছি………মাত্রই তো হোটেল ফিরলো এর মধ্যে আর কি হবে!
এদিকে বিথী ফ্যাসাদে পড়ে গিয়েছে কারণ সে না দেখেই একটা শর্ট হাতাকাটা টপস থ্রি কোয়াটার প্যান্ট। যা সে বিয়ের আগে প্রায়ই বাসায় পড়তো এখানে হয়তো ভুলবশত চলে এসেছে। যেহেতু সে গোসল করে ফেলেছে তাই বাহিরেও যেতে পারবে না নতুন কাপড় আনতে। অগত্যা সে ঐ বস্তই পড়ে বের হলো। বিধান কাপড় বদলে বিছানায় বসে ফোন চালাচ্ছিলো হঠাৎ সামনের দিকে চোখ যেতেই হা হয়ে যায় কারণ বিথীকে এমন কাপড়ে সে কখনো দেখেনি। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বিথীকে কোলে তুলে নিয়ে ডুব দিলো ভালোবাসার সমুদ্র যেখানে শুধু আছে তারা এবং তাদের ভালোবাসা।
পরেরদিন বিকেলবেলা সবাই মিলে বার্মিজ মার্কেট গেলো সেখানে সেদিনের ঐ ছেলেটাকেও দেখতে পেলো বিথী। আজকে সকাল থেকে বিধানরা যেখানে যেখানে গিয়েছে সেখানে সেখানে এই ছেলেটাকেও উপস্থিত দেখেছে। প্রথমে কোইন্সিডেন্স ভাবলেও এখন ভয় হচ্ছে কারণ কোইন্সিডেন্স একবার হয় তাই বলে প্রতিবারই। সে কাউকে বলতেও পারছে না যদি তার ভাবনা ভুল হয় তখন কি হবে।
তারা সবাই একটু হাতে তৈরি অলংকারের দোকানে ঢুকে। বিথী এদিক ওদিক বিভিন্ন জিনিস দেখছে আর বিধান তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই তার এক জোড়া কাঠের চুড়ি খুব পছন্দ হয় তাই বিধানকে দেখাতে পাশে তাকাতেই দেখে বিধান নেই। আশাপাশে খুঁজতেই চোখ পড়ে পাশের দোকানে। সেখানে দাঁড়িয়ে বিধান দিশাকে শাড়ি পছন্দ কিরে দিচ্ছে এবং নানা খুনিশুটি চলছে তাদের মাঝে যা বিথীকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে।
এর মধ্যেই এক বছর পাঁচের ছেলে এসে বিথীকে চিরকুট ধরিয়ে বিথী কিছু বলার আগেই চলে যায়। বিথী বেশি কিছু না ভেবে তা পড়তে শুরু করে।
চিরকুট,
তোমাদের স্বামী-স্ত্রীকে দেখে যা বুঝতে পারলাম তোমার স্বামী তোমার সাথে সুখী না। তাই তো তোমার চেয়ে বেশি ইন্টারেস্ট তার অন্য নারীর দিকে দেখো এখনও তোমাকে ছেড়ে সে তার কাছে। তোমাকে দিয়ে তার না চললেও আমার দৌড়বে! এরো আবেদনময়ী নারীকে ছেড়ে কি করে তোমার স্বামী……….থাক বাদ দেও আমাকে জানিও আজ রাত তাহলে আমাদের বিশেষ সাক্ষাৎ হচ্ছে নাকি।
বিথীর কষ্টগুলো মুহূর্তেই রাগে ও ক্ষোভে রূপান্তর হলো চিরকুটটি পড়তেই। রাগ যেনো তার উপচে পড়ছে। তবে ঐ ছেলেটার থেকে বেশি বিধান ও দিশার উপরই রাগ হচ্ছে। তাদের জন্যই ছেলেটা কুরুচিপূর্ণ চিরকুট লিখার সাহস পেলো। রাগে ফোস ফোস করতে করতে বিধান ও দিশার দিকে তাকাতেই তা যেনো বিথীর রাগের দহনকে আরো বাড়িয়ে দিলো ঘী ঢেলে। কথায় আছে শান্ত মানুষ রেগে গেলো ভয়ংকর অবস্থা হয় বিথীরও তো সেই দশাই। তাহলে কি ভয়ংকর কিছু ঘটতে চলেছে তাদের সংসারে!
চলবে,,,,