সাঁঝের প্রেম !! Part- 13
মাহবুব একটা ফুলের মালা হাতে নিয়ে হোটেলে ঢুকে। নিশির তরক্ষণে সাজ শেষ হয়ে গেছে। নিশি খোপায় ক্লিপ লাগাতে লাগাতে এসে দরজা খুলল। মাহবুব তখন দরজায় এক হাত রেখে হ্যালান দিয়ে নিশিকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখছিলো। নিশি শাড়ি ঠিক করছিলো।
-কি দেখছেন হ্যা? (চোখ রাঙিয়ে নিশি)
-স্যরি। (ভেতরে ঢুকে মাহবুব দরজা বন্ধ করে দিলো)
-হাতে কিসের মালা?
-ভেতরে ঢুকার সময় বাইরে দেখলাম তাই কিনে নিয়ে এলাম। তুমি তো ফরচুনেটলি খোপাও করেছো। আসো পরিয়ে দেই।
মাহবুব নিশির থেকে আরো কয়েকটা ক্লিপ নিয়ে নিশির খোপায় মালাটা পরিয়ে দিলো। মাহবুব টিপ পরা পছন্দ করেনা তাই নিশি আর টিপ পরেনি। মাহবুব টি টেবিলের উপর বসে নিশির হাঁটাচলা দেখছিলো আর নিশি মাহবুবের তাঁকানো দেখে আনইজি ফিল করছে। কিছুক্ষণ পর দুজন একসাথে ডিনার করে আসে। রুমে ঢুকে নিশি শাড়ি খোলার জন্য ওয়াশরুমে যায় কিন্তু এত পরিমাণ সেফটিপিন যেগুলো নিশি কিছুতেই খুলতে পারছেনা। শেষে ওয়াশরুমে সব এলোমেলো করে নিশি মাহবুবকে ডাকছে।
-এই শুনছেন? এইইইইই! (নিশি)
-বলো।
-একটু শুনে যান না!
-কি?
-সেফটিপিন গুলো খুলে দেন না প্লিজ। আমি পারছিনা।
-বাইরে বেরিয়ে এসো।
-আসছি।
নিশি শাড়ির আচলটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। নিশিকে এইভাবে এলোমেলো দেখে মাহবুবের হৃদয়ে প্রচন্ড জোরে আঘাত করে। মাহবুব ইন্সট্যান্ট নিজেকে কন্ট্রোল করে নেয়। নিশি আনইজি ফিল করলেও কিছু করার নাই কারণ ও ফেঁসে গেছে। মাহবুব যত্ন করে নিশির শাড়ির পিনগুলো খুলছে। নিশির শরীরে মাহবুবের হাত লাগছে আর নিশি পাগল হয়ে যাচ্ছে আবার নিজেকে সামলে নিচ্ছে। মাহবুব যখন কুচির সেফটিপিন গুলো খুলতে গেলো তখন মাহবুব চোখ বন্ধ করে ফেলে কারণ ভুলটা যাতে মারাত্মক পর্যায়ে না যায়। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। নিশির শাড়ি খোলা শেষ হয়ে গেলে মাহবুব কি মনে করে যেন নিশির চুল ও খুলে ফেলল। সাদা ফ্লোরে সেফটিপিন, কালো ক্লিপ আর ফুলগুলো ছিঁড়ে পরে আছে। মাহবুব নিশিকে দেয়ালে ঠেকিয়ে আঙুল দিয়ে ওর ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে। হাত দিয়ে নিশির চোখের কাজল নষ্ট করে।
-কি করছেন আপনি? (ভারী গলায় নিশি)
-আমি জানিনা আমি কি করছি। আমি হিপনোটাইজড নিশি! আই এম হিপনোটাইজড নিশি!
-এইটা কিন্তু চরম ভুল। ছাড়ুন।
-ভুল, শুদ্ধ এই মুহুর্তে আমি মানব না, স্যরি। (নিশির চুলের মুঠ ধরে নিশির চোখের দিকে তাঁকায় মাহবুব)
নিশিও মাহবুবকে জড়িয়ে ধরে। ভুল করবেনা বলেই এত আয়োজন কিন্তু ভুল হয়েই গেলো। এর খেসারত এখন কে দিবে?
রাত একটা…..
নিশি ফ্লোরে বসে কাঁদছে আর গায়ে একটা চাদর। মাহবুব ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। নিশির লম্বা চুলে মুখ ঢেকে গেছে। মাহবুব এখন নিজেই ঘৃণায় মরে যাচ্ছে। ওর দ্বারা এত গর্হিত কাজ কিভাবে হলো? ইচ্ছে করছে এখনি তিন তলা থেকে ঝাপ দিতে। এখন যদি নিশি কন্সিভ করে যায়? ওকে তো আমি বিয়ে করব নিশ্চিত কিন্তু ওর কি হবে এখন? ওর সামনে যাব কিভাবে আমি? এই আবেগে ভুল তো করে ফেলেছি কিন্তু এখন মাশুল দিব কিভাবে? হাজারটা চিন্তা ভাবনা একসাথে জটলা বাঁধছে মাহবুবের মাথায়। মাহবুব শেষ পর্যন্ত ঘরে এসে নিশিকে বলে,
-নিশি উঠো। স্যরি বলার মুখ আমার নাই। আমি কালকেই তোমায় বিয়ে করব।
-নিশি কিছু বলছেনা।
-আমি এক্ষুণি বাইরে থেকে আসছি। তুমি ফ্রেশ হও উঠে। কাঁদবেনা একদম।
মাহবুব বাইরে গিয়ে নিশির জন্য অনেক খুঁজে ওষুধ নিয়ে আসে। এসে দেখে নিশি বসে আছে। মাহবুব নিশিকে মেডিসিনটা দিয়ে বলে,
-খাও।
-কি এইটা?
-খেতে বলছি খাও। আমি চুল আঁচড়ে দিচ্ছি।
মাহবুব চিরুনি নিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে আর নিশি মন খারাপ করে বসে আছে। এতটা হেল্পলেস ওর আগে কখনো লাগেনি। মাহবুব এর ও সেইম অবস্থা কিন্তু নিশি যাতে ভেঙে না পরে এজন্য মাহবুব নিজেকে শক্ত রেখেছে। রাতে নিশিকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে মাহবুব পাইচারি করছে। তখনি ওর আরাফের কথা মনে পরে। ওর কলেজ লাইফ আর ভার্সিটি লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ড আরাফ। অনেক ভালবাসে দুজন দুজনকে। সবকিছু শোনার পর আরাফ হতভম্ব হয়ে যায় কারণ মাহবুবকে দিয়ে এমন কিছু সম্ভব না। মাহবুব রীতিমতো কাঁদছে।
-দেখ মাহবুব নিজেকে সামলা। এখন তুই প্রতিষ্ঠিত। তোর কোনো ভয় নেই বউকে খাওয়ানো, পরানো নিয়ে। নিশিকে বিয়ে কর।
-হ্যা আমি ওইটাই করব। কিন্তু আমি বিয়ের কথা বলার পর ও তো আমায় কিছু বলল না।
-দেখ এইটা একটা মেয়ের জন্য অনেক সেন্সিটিভ ব্যাপার! তুই যতটা টেনসড এই মুহুর্তে তার চেয়ে হাজারগুণ টেনসড থাকা উচিৎ নিশির। তোর জায়গায় অন্য কেউ হলে এই ভাবনা গুলো ভাবতো না। রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ মাহবুব!
-চুপ কর তো তুই! আমি আমার জ্বালায় মরছি।
-বিয়ে কর আগে।
-হুম।
আরাফ ও সেইম এডভাইস করলো মাহবুবকে আর তা হচ্ছে বিয়ে। মাহবুব ঘরে এসে নিশির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাঁকিয়ে স্যরি বলল। এরপর বিছানার একপাশে শুয়ে পরলো। মাহবুব সারারাত ভাবলো কি হবে এখন? আমি তো এমন কিছু চাইনি!
পরেরদিন সকালে,
নিশি ঘুম থেকে উঠে দেখে মাহবুব ঘুমাচ্ছে। হয়ত অনেক রাতে ঘুমিয়েছে তাই এতবেলা অবধি ঘুমাচ্ছে। নিশি আর ডাকেনি মাহবুবকে। নিশির ফোনে কল আসে তখন। মা ফোন করেছে। নিশি ফোনটা রিসিভ করার পরেই মা কড়া গলায় জিজ্ঞেস করে,
-তুই কোথায়?
-ট্রিপে।
-কিসের ট্রিপে তুই? গত কালকে রাতে তোদের ভার্সিটির বাস ট্রিপ থেকে ফিরেছে। তোর বাবা নিজের চোখে দেখেছে। তুই তাহলে কোথায় এখন? তোর বাবা তোর জন্য কাল রাতে আমায় চড় মেরেছে। কোথায় তুই নিশি?
-নিশি চুপ করে আছে।
-নিশি দুপুরের মধ্যে বাড়ি আয় তুই। আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন। এতটা নির্লজ্জ হয়ে গেছিস তুই? বাবা মা কে মিথ্যে বলিস? কোথায় কোন বেহায়াগিরি করতে গিয়েছিস বল আমায়?
-আসছি আমি।
নিশি তখন হাউমাউ করে কাঁদছে। নিশির কান্নার আওয়াজে মাহবুব জেগে যায়। পেছনে তাঁকিয়ে দেখে নিশি কাঁদছে।
-কি হয়েছে? কেনো কাঁদছো তুমি? (নিশির সামনে বসে মাহবুব)
-মা ফোন করে অনেককিছু বলেছে আমায়। আসলেই আমি দুশ্চরিত্রা হয়ে গিয়েছি।
-একটা থাপ্পর মারব ধরে নিশি উলটাপালটা কথা বললে! কি হয়েছে সেইটাই বলো।
নিশি মাহবুবকে সব বলার পর মাহবুব একটু স্বস্তি পেলো। রীতিমতো হাসছে মাহবুব।
-আর ইউ ক্রেজি? আপনি হাসছেন? (নিশি)
-তোমার আম্মু মানে আমার শ্বাশুড়ি মা আমায় টেনশন ফ্রি করে দিলেন। চলো আজকেই ঢাকা ব্যাক করব। এরপর ডিরেক্ট তোমার বাসায় যাব এরপর বাকি কথা শ্বশুর আর শ্বাশুড়ির সামনে হবে।
-কি বলবেন আপনি?
-রেডি হও। আমি অনলাইনে টিকেট কাটছি।
নিশি মাহবুবের জামাকাপড় গোছালো আর নিজেরটাও গোছালো। মাহবুব টিকেট কেটে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যায়। এগারোটায় বাস। রাত তো হবেই যেতে যেতে। সন্ধ্যায় মাহবুব নিশিকে নিয়ে নিশির বাসায় যায়। নিশির বাবা চেয়ারে বসে আছে আর মা কাঁদছে। তুর্নাও চুপ করে বসে আছে। মাহবুব আর নিশিকে একসাথে দেখে নিশির মা দাঁড়িয়ে যায়। নিশির বাবা নিশির গালে ঠাস করে চড় মেরে দেয়।
-আংকেল কি করছেন আপনি? (মাহবুব)
-চুপ একদম। আমার আর আমার মেয়ের মাঝে কোনো থার্ড পার্সন এলাউ করবনা আমি। (পুরো রেগে আছে নিশির বাবা) কালকে রাতে কোথায় ছিলি? (নিশির বাবা)
-ফ্রেন্ড এর বাসায়। (নিশি)
এইটা শোনার পর নিশিকে আরো একটা সজোরে চড় মারলো নিশির বাবা। নিশি সামলাতে না পেরে পরে যায় আর দেয়ালে বারি খায়। মাহবুব নিশিকে উঠায় আর কড়া গলায় নিশির বাবাকে বলে,
-ইনাফ আংকেল! ও আপনার মেয়ে ছিলো কিছুক্ষণ আগেও কিন্তু এখন ও আমার বউ। সো আপনি এইভাবে আমার সামনে ওকে মারতে পারেন না। (মাহবুব)
-মেরিজ সার্টিফিকেট কোথায়? বিয়ে যে করেছো কাগজ কোথায়? (নিশির বাবা)
-এক্ষুণি করব। চলো নিশি। (নিশির হাত ধরে মাহবুব)
-খবরদার! ছাড়ো ওর হাত আর বেরিয়ে যাও এই বাড়ি থেকে।
-যাব তবে নিশিকে নিয়ে। আর হ্যা আংকেল আমি যা তা ছেলে নই। সব পাবলিক এক্সামে র্যাংক করেছি আর বর্তমানে ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার পদে আছি। আশা করছি আপনার মেয়েকে ভাল রাখতে পারব।
-আমার কসম নিশি যদি তুই ওই ছেলের সাথে বেরিয়েছিস আমার মরা মুখ দেখবি তুই। (বাবা)
নিশি দাঁড়িয়ে সব শুনছে। নিশি মাহবুবের হাত ছেড়ে দেয় আর মাহবুবের চোখের দিকে তাঁকিয়ে বলে,
-বাবা মানবেনা!
-সো হোয়াট? তুমি আমায় ভালবাসো না?(মাহবুব)
-না বাসেনা। বেরিয়ে যাও তুমি এই বাড়ি থেকে। আমি তোমার মতো ভন্ড ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিবনা।
-আংকেল আমি আপনার কথাগুলো হজম করতে পারছিনা কারণ আপনি আমাকে যেই বিশেষণে বিষেশায়িত করছেন আমি তা নই। নিশি চলো।
নিশি মাহবুবকে বলে,
-আপনি বাসায় যান। আমি পরে জানাচ্ছি আপনাকে।
-পরে কেনো? এখন কি?
-প্লিজ বাসায় যান। (হাত জোর করে নিশি)
-ওকে আমি অপেক্ষা করছি।
মাহবুব চলে গেলো। নিশির বাবা তখন নিশির হাত ওনার মাথায় রেখে বললেন,
-কোনোদিন ওই ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখবিনা। যদি রাখিস তাহলে আমি সেইদিন মরব। আর তোর সুখের জন্য পরিবারের লাশের ভার তুই বইতে পারবি তো?
-নিশি চুপ করে আছে।
-বাবা ও অনেক ভালো ছেলে। আমি ভালবাসি ওকে। এমন কসম আমায় দিও না তুমি যেইটা আমি রাখতে পারবনা। (হাত নামিয়ে নিশি)
-একদম মেরে ফেলবো তোকে। তোর মতো মেয়েকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম? সারারাত কোথায় নষ্টামি করে এসেছিস আর এখন বড় বড় কথা কিভাবে বলছিস? (আম্মু)
-আম্মু? তুমি বলছো এসব?
-হ্যা বলছি। বাবাকে কথা দে আর ওই ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখবিনা। (মা)
-কিন্তু কেনো? ওর দোষ কোথায়?
-দোষ নেই কিন্তু তোর বিয়ে ঠিক করে রেখেছে তোর বাবা।
-স্যরি বাবা-মা। আমি মাহবুবকে ভালবাসি।
-আর আমি তোর বাবাকে ভালবাসি। এখন বল তুই কি করবি? স্বার্থপরের মতো নিজেরটাই ভাববি?
নিশি আর কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে আসে। মাহবুব নিশ্চিত নিশি ওর কাছেই আসবে। মাহবুব বাসায় জানায় ও একটা মেয়েকে ভালবাসে। মাহবুবের ছোট মা হইহুল্লা করে এ নিয়ে কিন্তু এতে মাহবুবের কিছু যায় আসেনা। মাহবুবের বলার দরকার তাই মাহবুব বলেছে। এইদিকে নিশি মাহবুবকে ফোন করে বলল,
-আপনি ভাল থাকবেন। আপনাকেই ভালবেসেছি আর ভালবাসবো। এইটুকুতে খুশি আমি যে আমার সর্বস্ব আপনাকে দিয়েছি। খুব ভালবাসি আপনাকে। তেমনি আমার মা ও তো ভালবাসে আমার বাবাকে। আমি যে স্বার্থপরের মতো নিজের কথা ভাবতে পারিনা। (নিশি কাঁদছে) বাবা নাকি আমার বিয়ে ঠিক করেছে। কিন্তু আমিও বাবাকে শর্ত দিয়েছি আমি বিয়ে করবনা, ওনার সব কথা শুনবো।
-তাহলে আমার ঝুলি নিঃস্ব তাই তো? আমার তো কেউই ছিলনা তুমি ছাড়া। তুমিও এইভাবে চলে যাচ্ছো? পরিশেষে আমি একাই! তোমার পরিবার প্রায়োরিটি পেয়েছে কিন্তু আমি না কেনো?
চলবে