সাঁঝের প্রেম !! Part- 08
মাহবুবকে ঘরে ঢুকতে দেখে নিশি মাহবুবকে সাইড দিলো। মাহবুব আলমারি থেকে নরমাল একটা পাঞ্জাবি আর প্যান্ট বের করে ওয়াশরুমে গেলো চেঞ্জ করতে। এখনো পর্যন্ত নিশি নিশ্চুপ। মাহবুব ওয়াশরুমে যাওয়ার পরেই দরজায় বেল বাজলো। নিশি দরজা খুলে দেখে আরাফ এসেছে। আরাফ নিশিকে বলে,
-ঘামছো কেনো? বেশ ঠান্ডা তো এখন।
-না ঘামছিনা।
-মাহবুব কোথায়?
-জামাকাপড় নিয়ে কোথায় গেলো দেখলাম। জানিনা কোথায় গেছে।
-চেঞ্জ করছে মনে হয় তাহলে। তুমি ফ্রেশ হবেনা?
-না। এভাবেই ভালো লাগছে।
-রাত তো অনেক হলো। ক্ষুধা লাগেনাই?
-না খেয়ে এসেছি। আপনি খেয়ে এসেছেন?
-হ্যা।
আরাফ ডায়নিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসলো আর টেবিলের উপর থেকে গ্লাস নিয়ে পানি খেলো। মাহবুব তখন টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেডরুম থেকে বের হয়। নিশি আরেকটা রুম দেখছে।
-কিরে এত দেরি করলি? (মাহবুব)
-ভাবছি কাল দুপুরের ট্রেনে বা বাসে চলে যাব।
-কেনো?
-আর তো কাজ নাই আমার। যে কাজের জন্য এসেছিলাম সে কাজ হয়ে গেছে। নিশি একটু শুনে যাও।
নিশি ডায়নিং রুমে এসে দাঁড়ায়। মাহবুব চেয়ারে পা উঠিয়ে পায়জামার নিচের অংশ ভাঁজ করছে। আরাফ বলছে,
-তোদের দুজনকেই বলছি যা হয়েছে তা তো হয়েছেই। এসব নিয়ে মান অভিমানের কোনো প্রয়োজন নাই। নিজেদের মধ্যে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিয়ে একে অপরের পাশে থাকিস ঠিক আগের মত। নিজেদের সংসার নিজেরা বুঝে নিবি। আর নিশি তোমার কাছে আমি আমার বন্ধুটার দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। দেখো ওকে। আর মাহবুব তোকেও সেইম কথা বলছি।
দুজনেই চুপ। মাহবুব ফ্রিজ খুলে সফট ড্রিংকস এর বোতল বের করে খেতে শুরু করলো আর আরাফকে দিলো একটা। মাহবুব খেতে খেতে বলল,
-ইউ নো হোয়াট আরাফ আমি কখনো কাউকে আর কোনোকিছুতে জোর করবনা। ওর ইচ্ছে মতো ও চলবে আর আমার ইচ্ছেমতো আমি। বিয়েটা নাটকীয় ভাবে হলেও আমার জীবন কিন্তু নাটকের নিয়মে চলবেনা। ও ওর জায়গা থেকে স্বাধীন আর আমি আমার। আমার মনে হয়েছে যেহেতু একবার আমি ভুল করে ফেলেছি তাই ভুলটা শুধরে ওকে বিয়ে করাটা দরকার। ঠিক সেই চিন্তা মাথায় রেখেই ওকে বিয়ে করা। ওর যদি কখনো অন্য কোথাও বিয়ে হতো তাহলে ও নিজেকে মাফ করতে পারলেও আমি কখনোই পারতাম না। তাই ওর সম্মান অক্ষুণ্ন রাখতেই ওকে বিয়ে করা।
-এগুলো কোনো কথা ভাই? (আরাফ)
-হ্যা এইগুলোই কথা।
নিশি হাসছিলো। নিশিকে হাসতে দেখে আরাফ জিজ্ঞেস করে,
-তুমি হাসছো কেন?
-কি করব ভাইয়া বলেন? আপনার বন্ধু তো আমায় দয়া করেছে না? তাই হাসছি। আমার সম্মান রক্ষার্থে বিয়েটা করেছে আপনার বন্ধু। বেশ ভালো ছিলো কথাটা।
-আরাফ ঘুমাতে আয়৷ আজাইরা কথা শোনার টাইম আমার নাই। (মাহবুব উঠে দাঁড়িয়ে)
-ঘুমাতে আয় মানে? তুই কি আমার সাথে ঘুমাবি নাকি? (দাঁড়িয়ে গিয়ে আরাফ)
-অবশ্যই।
-মাহবুব আজ তোর বাসর রাত। (আরাফ)
-সেইটা পাঁচ বছর আগে হয়ে গিয়েছে। বারবার বাসর করতে হয়না। এই চিটাগং এই সেইটা হয়েছে আর তোর ভাষায় সাঁঝের প্রেম। বাই দ্যা ওয়ে ও তো জামাকাপড় আনে নাই। আমার আলমারিতে তোমার কিছু পুরোনো জামাকাপড় আছে নিশি। আজকে রাতটা ম্যানেজ করে নিও। কাল নতুন জামা এনে দিব।
মাহবুব এইটুকু বলেই অন্য একটা ঘরে চলে যায়। বিছানা ঠিক করে মাহবুব শুয়ে পরে। আরাফ মাহবুবের পাশে গিয়ে শোয়।
-কাজটা তুই ঠিক করলি মাহবুব? ও এখন তোর বউ হয়। ও তোর থেকে স্বামীর অধিকার পায়। (আরাফ)
-আগে আমাকে স্বামী মানুক এরপর। দোস্ত মন থেকে বলছি ওকে আমি বিয়েটা করেছি ওর সম্মান রক্ষার জন্যই। তাই আমি বিয়েতে কোনো বাঁধা দেইনি। জীবনে বিয়ে না করলে কি হত? ৩০ বছর তো পেরিয়ে গেছে একা একা থেকেই। বাকি ৪০ ও কেটে যেত। ওর স্মৃতি নিয়েই থাকতাম।
-এখনো জীবনের অনেকটা সময় পরে আছে মাহবুব। নিজেকে এভাবে মেরে ফেলিস না।
-আমি অনেক আগেই মরে গেছি। নতুন করে আর মরার কিছু নাই। ঘুমা। গুড নাইট।
মাহবুব পাঞ্জাবি ঠিক করে পাশ ফিরে শুয়ে পরে। আরাফ ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তবে আরাফ বিশ্বাস করে একদিন সব ঠিক হবে। নিশি ঘরে গিয়ে একটা একটা করে খাট থেকে ফুল ছিঁড়ে নিচে ফেলে সাথে চোখের পানি।
– এতটা ভালবাসা জমেছিলো তোমায় দেয়ার, এতটা স্বপ্ন বুনেছিলাম একটু একটু করে সেইটাও ভেঙে গেলো। প্রেমিককে বিয়ে করতে পারলে নাকি মেয়েরা অনেক ভাগ্যবতী হয়। তাহলে আমার কেনো কষ্ট হচ্ছে? (নিশি)
নিশি শরীর থেকে একটা গহনাও খুলেনি। ফুলগুলো ছিঁড়ে ফেলে খাটেই বসেছিলো বউ সাজ নিয়ে। কি মমে করে যেন নিশি জানালার বাইরে হাত দিয়ে এক টুকরা কলাপাতা ছিঁড়ে।
-কলাপাতার সংসার পাঁততে চেয়েছিলাম আমরা তাইনা? সেই কথা কি তোমার মনে আছে মাহবুব? তোমায় যখন আমি জিজ্ঞেস করতাম “কিভাবে সংসার করব আমরা?” তুমি বলতে “প্লেট কিনতে না পারলে কলাপাতায় খাব, পাতিল কিনতে না পারলে টিনের উপর রান্না করব, খাটে ঘুমাতে না পারলে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে ফ্লোরেই ঘুমাবো, ঘরে আসবাবপত্র কিনতে না পারলে ফ্লোরকেই আপন করে নিব।” আজ তোমার সবই আছে কিন্তু আমি নেই। নেই ভালোবাসাও। সেই ভালবাসা কোথায় গেলো তোমার? কথা দিয়েছিলে কখনো আমায় ভুলবেনা, তবে আজ কেনো করছো এমন? তুমি আমায় সম্মান রক্ষার জন্য বিয়ে করেছো? এ কথা তোমার মুখ দিয়ে আসলো কিভাবে? আমি কি এতটাই পচে গেছি তোমার কাছে?
নিশি কাঁদছে আর আপন মনে বিলাপ করছে। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় নিশি ঘুমিয়ে যায়। মাহবুবের ঘুম আসছিলো না বলে মাহবুব উঠে এলো কফি বানাবে বলে। নিশির ঘরে বাতি জ্বলছে দেখে মাহবুব দরজার বাইরে তাঁকিয়ে দেখলো নিশি শুয়ে আছে। আর ফ্লোরে ফুলের স্তূপ করা। নিশির উপর চাঁদর টেনে দিয়ে, লাইট অফ করে মাহবুব রান্নাঘরে এসে কফি বানায়। ড্রইংরুমে বসে মাহবুব টিভি দেখছে আর কফি খাচ্ছে। রাত প্রায় সাড়ে তিনটা। চারটার সময় মাহবুব টিভি অফ করে পেছনের জানালাটা খুলে দেয় আর কম্পিউটারের সামনে বসে। শুধু শুধু কিছুক্ষণ কম্পিউটার নিয়ে ঘাটাঘাটি করে ফজরের আযান দিলে নামাজ পড়ে নেয়। আটটায় অফিস। ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে অফিসের ড্রেস নিয়ে আসে মাহবুব। নিশি তখনো ঘুমাচ্ছিলো। সাড়ে সাতটা অবধি মাহবুব সবার জন্য ব্রেকফাস্ট বানালো। পরটা, অমলেট আর চিকেন কারি। চিকেন কারি রান্নার সময় মাহবুব কাশছিলো ঝাঁঝে। তখন নিশির ঘুম ভেঙে যায় আর আরাফ ও উঠে আসে।
-কিরে কি করছিস তুই? (আরাফ)
-ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছি। একটু পর বেরিয়ে যাব তো তাই তোদের খাবার বানিয়ে দিয়ে গেলাম। শেষ প্রায়। আমি রেডি হয়ে আসছি।
-আজ অফিস থেকে ছুটি নে। (আরাফ)
-রিজন?
-সবেমাত্র বিয়ে করেছিস। নিশিকে সময় দিবিনা?
-এতগুলো দিন নিজেকেই সময় দেইনি আর নিশি। আসছি আমি।
মাহবুব রেডি হয়ে এসে ব্রেকফাস্ট সার্ভ করে। নিশি তখন গোসল করে বের হয়। ভেজা চুলে টাওয়েল পেচিয়ে নিশি ডায়নিং এ আসে। এসে দেখে মাহবুব খাবার সার্ভ করছে।
-আমাকেও অফিসের জন্য বেরোতে হবে। (নিশি)
-As your wish. (মাহবুব)
ব্রেকফাস্ট করে মাহবুব বেরিয়ে যায়। আরাফ আর নিশি তখন বাসায়। আরাফ নিশিকে বলে,
-একটা রিকুয়েষ্ট করব রাখবে?
-জ্বি ভাইয়া বলুন।
-চাকরিটা ছেড়ে দাও। মাহবুব পছন্দ করেনা তার বউ চাকরি করবে। আর তুমি না বললেও মাহবুব তোমার আম্মু আর তুর্নাকে দেখবে।
-আমিও ভেবেছি আজই রিজাইন দিয়ে চলে আসব।তবে সেইটা আপনার বন্ধুকে খুশি করার জন্য নয়, নিজের খুশিতে।
-থ্যাংক ইউ সো মাচ। আমার বের হতে হবে। তুমি ব্রেকফাস্ট করে নাও।
আরাফকে খেতে দিয়ে নিশিও খায়। মাহবুবকে ফোন করে আরাফ বেরিয়ে যায়। দশটায় অফিসে গিয়ে নিশি রিজাইন লেটার দিয়ে আসে। নিশির বস প্রচন্ড রেগে গেছে এজন্য। বাট নিশির সেইটা দেখার সময় নেই। নিশি এরপর নিজের বাসায় চলে আসে। নিশির আম্মু তখন রান্না করছিলো।
-কিরে তুই এখন? জামাই কই? (আম্মু)
-অফিসে। তোমাদের বাস টাইম কয়টায়?
-আজকে সন্ধ্যায়।
-তুর্নার এক্সাম শেষে একবারে চলে আসবে। আমরা চিটাগং এই থাকব এখন থেকে। (নিশি)
-সেইটা না চাইলেও তোকে থাকতে হবে।
-হ্যা সে তো হবেই। রিজাইন দিয়ে আসলাম এই মাত্র। (পানি খেতে খেতে নিশি)
-ভালো করেছিস। জামাই এইসব পছন্দ করেনা।
-তোমরা কি করে চলবা?
-তোর সেভিংস দিয়ে ঠিক চলে যাবে। আমিও কিছু জমিয়েছিলাম।
-আমি এই বিষয়টা নিয়ে মাহবুবের সাথে কথা বলব।
-না দরকার নেই। এখন রান্না করছি। দুপুরে খেয়ে যাবি।
-হুম।
লাঞ্চের পর…….
নিশির ফোনে মাহবুবের কল আসে। নিশি অবাক হয়নি। স্বামী হয়ত তাই দিতেই পারে। নিশি ফোন রিসিভ করে।
-লাঞ্চ টাইম তো শেষ। বাসায় কখন আসবে? (মাহবুব)
-এখনি বের হব।
-কেনো?
-বাসায় এসেই বলব।
-ইচ্ছা। আমি বাসায়। সন্ধ্যায় তোমার জন্য মার্কেট করতে যাব। আশা করছি তারাতারি ফিরবে।
-হুম।
মাহবুব ফোন কেটে দিয়ে ফোনটা সোফায় ফেলে দিলো৷ শার্টের বোতাম খুলে সোফার উপর হ্যালান দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো মাহবুব। আধা ঘণ্টা পর নিশি বাসায় ঢুকলো। হাত থেকে পার্টস টা ডায়নিং এর উপর রাখলো নিশি। কিছুদূরেই মাহবুব চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। রাতে ঘুমায়নি তাই ঘুমিয়ে গেছে। নিশি মাহবুব কে না ডেকে গ্লাসের আওয়াজ করলো। মাহবুবের ঘুম পাতলা তাই জেগে গেলো। টি টেবিলের উপর থেকে চশমাটা নিয়ে মাহবুব পরলো। শার্টের বোতাম লাগিয়ে বলল,
-কখন বের হবে?
-তুমি যখন চাও।
-চলো এখন।
-চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি।
-কেনো? (অবাক হয়ে মাহবুব)
-করব না তাই।
-ভালো। গুড ডিসিশন।
-হুম।
মাহবুব নিশির পছন্দেই নিশির জন্য জামাকাপড় কিনলো। মার্কেট থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেলো। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে মাহবুব রানাঘরে যায় রাঁধবে বলে। নিশি তখন রান্নাঘরে গিয়ে বলে,
-তুমি বসো। আমি করছি।
-না। আমিই করি।
-আচ্ছা দুজনেই করছি।
-ইচ্ছা।
নিশি মাহবুবকে সবজি কেটে কেটে দিচ্ছিলো। মাহবুব জানে নিশি পেঁয়াজ কাটতে পারেনা। নিশি যখন পেয়াজ কাটতে যাবে তখন মাহবুব চাকুটা হাতে নিয়ে বলে,
-এইটা আমি কাটছি।
-মনে রেখেছো যে আমি পেঁয়াজ কাটতে পারিনা? (মাহবুবের দিকে তাঁকিয়ে নিশি)
-মনে না থাকার কিছু নেই।
দুজন একসাথে রান্না শেষ করে এক সাথেই ডিনার করলো। মাহবুব যখন বেডরুমে ঘুমাতে এলো না তখন নিশি পাশের ঘরে যায়। গিয়ে দেখে মাহবুব ফোন টিপছে।
-তোমার ঘরে আসবেনা? (নিশি)
চলবে