প্রেমে পড়া বারণ ( সিজন-2 ) Part- 08
আজ কেন জানি সব এলোমেলো লাগছে!
রাত প্রায় বারোটা।
সবাই নিজের রুমে চলে গেছে।সারাদিনের ক্লান্তিতে খুশবু শোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমে তলিয়ে গেছে।আমার চোখে ঘুম আসছে না। ভেতরে অস্থির অস্থির লাগছে। রেহানের কথা মনে পড়ছে বারবার। ওর সাথে কাটানো সময় গুলো নতুন করে ভাবাচ্ছে।
হঠাৎ মনে হলো কোথাও মিউজিক বাজছে।আস্তে আস্তে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, মিউজিক না,কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে।
অদ্ভুত সুন্দর, করুন সুর। এক মুহূর্তের জন্য ভেতর টা খা খা করে উঠলো।
কি নিদারুণ শূন্যতা এই সুরে।
আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলাম না। সুর টা কাছে আসছে.. আরও কাছে….
মনে হয় বাংলোর পাশে দিয়ে কেউ বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে।
জানালার কাছে এসে পর্দা সরিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। বাঁধ ভাঙা জোছনায় যতদুর দেখা যায়, সব নীরব, ফাঁকা। কেউ নেই।
তবুও শুনতে পাচ্ছি বাঁশি।
দেখলাম কেউ একজন বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে বাগানের ভেতরের রাস্তায়। এমনিতেই এখানে কাউকে চিনি না, আর লোকটাকে পিছনে থেকে দেখেছি।
হয়তো বাগানের কোনো ছেলে হবে, রাতে বাঁশি বাজিয়ে বাড়ি ফিরছে।
তবে মানতেই হবে দারুণ সুর।ঘোর লাগানোর মতো।
বিছানায় ফিরে আসলাম। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।।
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেছে। গড়াগড়ি করতে করতে আর ভালো লাগছে না। উঠে ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় আসলাম।
সবাই তখনও ঘুমে।
আধার কেটে দিনের আলো ফুটেছে সবে।
ঘাসের উপর হালকা শিশির।
ভাবলাম বাংলোর সামনে একটু ঘুরে আসি।
এতো সুন্দর সকাল মিস করা যায় না।
ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
বাংলোর চারদিকে চা গাছ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করা।বাংলোয় ঢোকার রাস্তার দু’পাশেও চা গাছের সারি।সকাল বেলায় এসবকিছুর সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে গেছে।
সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতির কয়েকটি ছবি নিয়ে নিলাম।
বাংলোর সামনে একটা ছোট টিলার মতো আছে। সেখানে একবার গিয়েছিলাম সবার সাথে। উপরে পরিষ্কার, কয়েকটা বড় বড় গাছ আছে।এই যায়গাটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। একেবারে মনের মতো। উপরে থেকে বাংলোর আশেপাশে খুব ভালো করে দেখা যায়।
আর তারচেয়ে ভালো লেগেছে, ওখানে ৪-৫ টা শিউলি ফুলের গাছ আছে। হেমন্তের মাঝামাঝি হালকা শিশির ভেজা ঘাসে টিলার উপরে আর নিচের দিকে ৪-৫ টা গাছের ফুল বিছিয়ে পড়ে থাকে ; সেই দৃশ্য একবার দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।
সেদিকে যাবো বলে পা বাড়াতেই চোখে পড়লো একটা মেয়ে হাতে একটা ছোট ঝুড়ি নিয়ে উপরে টিলার দিকে যাচ্ছে।
লাল পেড়ে সবুজ শাড়ি মেয়েটার গায়ে। খোলা চুল।
এতো সকালে মেয়েটাকে দেখে একটু অবাক হলাম। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি মেয়েটা গুনগুন করে ফুল কুড়াচ্ছে।
দৃশ্যটা মনে লেগেছে, ঝটপট কয়েকটা ছবি নিলাম।
তারপর মেয়েটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মেয়েটার মুখ এখনো দেখতে পাইনি।
কি বলে কথা শুরু করবো বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম
– তুমি ফুল কুড়াতে এসেছো?
এবার মেয়েটা আমার দিকে ফিরলো।
এতো মায়াবী মুখ!! অবাক হয়ে দেখছি মেয়েটাকে। এ কালো বললে ভুল হবে, চরম ভুল!!
দুধ সাদাও বলা যাবে না।
চাপা শ্যামলা রঙ, চোখ দুটো যেন হরিণের চোখ!
গায়ের রঙ শ্যাম বলেই মেয়েটাকে এতো মায়াবী লাগছে।
যদি ছেলে হতাম! হয়তো প্রথম দেখায় মেয়েটার প্রেমে পড়ে যেতাম।
ওর বয়স কত হবে? ১৬-১৭!
মেয়েটা একদৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে। কয়েক সেকেন্ড মনে হয় ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ঘোর কাটতেই খেয়াল হলো, আবার জিজ্ঞেস করলাম
– ফুল কুড়াতে এসেছো?
মেয়েটা একটু মুচকি হেসে মাথা নাড়ায়।
– আমিও কুড়াই তোমার সাথে?
মেয়েটা আবার মাথা নাড়ায়, মুখে কিছু বললো না।
আমি ফুল কুড়াচ্ছি ওর সাথে। কুড়ানোর সময় আবার জিজ্ঞেস করলাম, যদি কথা বলে!
– তোমার বাড়ি কি এখানে?
মেয়েটা আবার মাথা নাড়ায়, তারপর হাতের আঙুল দিয়ে ওর বাড়ি কোন দিকে দেখায়।
মেয়েটা কি বোবা! কিন্তু বোবা কালা হলে তো আমার কথা শুনতে বা বুঝতে পারতো না। হয়তো অনেক লাজুক! তাই কথা বলছে না।দ্বিধায় পড়ে গেলাম।
– আচ্ছা, সেই কখন থেকে মাথা নেড়ে যাচ্ছো! তুমি কি কথা বলতে পারো না???
এবার মেয়েটা ফিক করে হেসে উঠলো! সেকি হাসি! হেসে কুটিকুটি!!
ওর হাসি দেখে আমারও হাসি পাচ্ছে। আমিও হাসছি।
– কি নাম তোমার?
– জয়িতা।
মৃদু হেসে বললো।
– ” জয়িতা… বাহ.. ! খুব সুন্দর নাম।
– ফুল কুড়িয়ে কি করবে গো?
ফুল কুড়াতে কুড়াতে বললো
– পুজো দেবো গো,দেবতার।
বলেই আমার দিকে চোখ তুলে তাকালো।
চোখে মুখে হাসির ঝিলিক।
বুঝলাম জয়িতা হিন্দু। বাগানের শ্রমিকদের প্রায় সবাই হিন্দু।
ফুলের ঝুড়ি ভরে গেছে, শিউলি ছাড়াও আরও কয়েক ধরনের ফুল আছে ঝুড়িতে।
মেয়েটা ঝুড়ি হাতে টিলার গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে। যাবার সময় কোনো কথা বললো না আমার সাথে, শুধু একবার ফিরে তাকালো।
অদ্ভুত! একটু তো আলাপ হয়েছে, যাবার সময় তো বলে যেতে পারতো!
আমিও বাংলোয় ফিরে আসলাম। রেহান উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো
– কোথায় গিয়েছিলি এতো সকালে?
– সামনেই হাঁটছিলাম।
– এতো সকালে একা যাওয়া ঠিক হয়নি। শোন,একা এখানে কোথাও যাবি না।
– আচ্ছা যাবো না।
আগামীকাল আমরা ফিরে যাবো।।
তাই সকালে সবাই ঘুরতে গিয়ে ১২ টার মধ্যে ফিরে আসলাম।
লাঞ্চ করে সবাই রেস্ট নিলো।
বিকালে আরও একবার বের হবো।শেষবারের মতো ঘুরে দেখবো। কিন্তু আনিষার ভালো লাগছে না, ও যাবেনা। তাই তাহসিন ও যাবে না।
বাকিরা বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেছি।
অনি,রিফাত, দিয়া, খুশবু চা বাগানের ইতিহাস নিয়ে কথা বলছে, যুক্তি – তর্ক হচ্ছে।
আর এদিকে রেহান সেই কখন থেকে ফোন ঘাটছে আর হাঁটছে।কোনো কথা ওর কানে যাচ্ছে না বোধহয়!
দিয়া,খুশবু ওরা অনেক দূর চলে গেছে। আমি আর রেহান পিছনে, অনেক পিছনে। রেহান আস্তে হাঁটছে,আর আমার তো অভ্যাস! তার উপর রেহানের সাথে সাথে হাঁটছি।
কিছু দূর গিয়ে দেখি রাস্তা দু’দিকে চলে গেছে। এখন অন্যরা কোন পথে গেছে বুঝতে পারছি।
– রেহান.. এখন কোন রাস্তায় যাবো?
– এদিকে চল।
– ওরা যদি এ রাস্তায় না যায়?ফোন করি একটা।
– ওরাও হারিয়ে যাবে না,আমরাও না।
রেহানের কথায় আর ফোন দেইনি।
ভীষণ রাগ হচ্ছে রেহানের উপর। আমি সাথে আছি কিন্তু ও নিজের মতো ব্যস্ত। কি যে করছে! এরমধ্যে ওর একটা ফোন আসলো। কথা শুনে বুঝলাম দেশের বাইরে থেকে ওর কাজিন আনিস ফোন করেছে।
রেহান কথায় মশগুল।
আমি আর কি করি! এদিক সেদিক তাকিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ চোখে পড়লো জয়িতাকে।
আমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। ও একটু এগিয়ে এসে হাতে ইশারা করলো।
আমিও এগিয়ে গেলাম কথা বলার জন্য।
– কই যাচ্ছো গো?
– ঘুরতে বেরিয়েছি।
– তোমার সাহেব বুঝি??
রেহানকে দেখিয়ে বললো।
আমি একটু হেসে বললাম
– ও আমার বন্ধু।।
– ওমা! বন্ধুর সাথে একা বেড়াতে এসেছো!!
– একা কেন! আমার আরও বন্ধুরা এসেছে। সাথে আমার কাজিন,ভাই,বোন ওরাও এসেছে।
– পদ্ম পুকুর দেখবে?
– পদ্ম পুকুর? কোথায়?
– অইযে ওইখানে…. রাস্তার ওপাশে।
হাত বাড়িয়ে দেখালো।
– তুমি আমাদের বাংলো চিনো?
– ওমা! চিনবো না কেন?? ও আমি ভালো করে চিনি। সবাই চেনে।
মনে মনে ভাবলাম রেহানের কোনো খেয়ালই নেই আমি একজন মানুষ সাথে আছি।এতো সময় কথা বলছি অথচ ফিরে দেখেনি আমি কোথায়! একটা শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো!
জয়িতাকে বললাম – চলো।
রেহানকে কিছু না বলে চলে গেলাম জয়িতার পিছু পিছু। জয়িতার সাথেই বাংলোয় ফিরবো।
হাঁটছি তো হাঁটছি।কিন্তু পদ্ম পুকুর কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
চলবে………