পরিণয়ে পরিণতি

পরিণয়ে পরিণতি !! Part- 09

মুনতাহা অন্ধকারে কিছুই দেখছে না। ঘুমন্ত চোখে আবছায়া আলোয় মানুষের আবরণ বুঝা যাচ্ছে।
কে হতে পারে বাসায় চোর টোর ঢুকলো নাতো!! বিয়ে বাড়িতে চোরের উৎপাত বেশি থাকে।
ধীরে ধীরে পা পেলে লাইট জ্বালাবার মুহুর্তে কে যেন হাত ধরল। মুনতাহা যে চিৎকার করতে যাবে মুখ চেপে ধরেছে। মুনতাহার ঘাড়ে গরম নিশ্বাস ফেলে সাইমুন ফিসফিস করে বলে,,
— আমি আরে আমি!! ভয় পেও না।।
মুনতাহা সাইমুন কে ধাক্কা মেরে রাগ করে বলে উঠলো,,
— তুমি এত রাতে এখানে কি করছ??
— কেন আসা যাবে না!
— না। অন্যের হবু বর কে আমি মাঝরাতে আমার রুমে এলাউ করছিনা।
— ভুলে যেও না আমি এখনো তোমার স্বামী। আমাদের কিন্তু ডিভোর্স হয়নি।
— তোমার কি বিন্দু পরিমাণ লজ্জা নেই। নাকি ২ য় বিয়ে করবে বলে যেটুকু বিবেকবোধ ছিলো সেটুকু গেছে। কাল বিয়ে আজ আমার ঘরে কি চাই তোমার??
সাইমুন ভাবছে মুনতাহা জড়িয়ে ধরে বলবে,, সাইমুন আমি তোমাকে হারাতে চাই না। তোমাকে ছেড়ে থাকার সাধ্য আমার নেই। তোমার ভালোবাসার ভাগ কাউকে দিতে পারব না।
— ঘুম আসছিলো না তাই ভাবলাম তোমার সাথে কথা বলে যাই। ভেবেছি আমার জন্য তোমার কষ্ট হচ্ছে। এখন দেখছি তুমি দিব্বি ভালো আছো।
— তুমি কি চাও আমি তোমাকে কাছে পাওয়ার আশায় প্রহর গুনে অপেক্ষায় থাকি।। তোমার এসব নাটক নিতে পারছিনা। প্লিজ এ ঘর থেকে বের হয়ে যাও।
— তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে না। কাল থেকে আমি অন্য কারো। ভালোই হয়েছে তুমি সময় থাকতে নিজেকে শুধরে নিয়েছ।
সাইমুন, মুনতাহার কথা আড়ালে দাঁড়িয়ে মুনতাহার শাশুড়ী শুনছিলো। মুনতাহার শাশুড়ী চিন্তায় পড়ে গেলেন কি হতে যাচ্ছে এ ভেবে।
সাইমুনের সাথে কঠিন হতে মুনতাহার খুব কষ্ট হচ্ছে। মুনতাহা চায় সাইমুন কোন মায়ার মোহজালে না পড়ে নিজ থেকে ফিরে আসুক। সত্যি কি ফিরে আসবে!!
মুনতাহা জানে হাজারো কষ্টের মাঝে সাইমুন মুনতাহা কে স্বান্তনা দিবে না। সাইমুন কে ভালো না বাসলে মুনতাহা ভালোবাসার কষ্ট টাই অনুভব করতে পারত না।
খুব জানতে ইচ্ছে করে সাইমুনের হাসিতে কি কখনো আমার কষ্ট গুলো খুব গোপনে লালন হয়েছিলো।
ও কি কখনো সম্মতির আড়ালে আমার শূন্যতা অনুভব করেছিলো। কাল যে মানুষ টা পর হয়ে যাবে তাকে নিয়ে আর ভাবতে চাই না।
……
অবন্তিকার মানসিক শক্তি পাচ্ছে না বিয়ের জন্য পার্লারে সাজার। কার জন্য সাজবে কাকে দেখাবে!! আহানাফ এর ভালোবাসা তাকে খুব তাড়া দিচ্ছে। ফেলে যাওয়া স্মৃতি বার বার পিছু ফিরে ডাকছে।
“অবন্তিকা তোমার জন্য বাবা পার্লারের লোক ঠিক করেছে। তুমি ঠিকমত গোসল করে নিয়েছ??
— দেখো ভাবী তোমরা সব জানার পরেও আমাকে অযাথা পেইন কেন দিচ্ছ। আর কেউ না বুঝুক তুমি তো জানো বিয়ে নিয়ে আমার কোন স্বপ্ন নেই। আমার সকল স্বপ্ন আমি নিজে পুড়িয়ে আকাশের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছি। আমাকে বিরক্ত কর না।
বিয়েতে একটু হলেও সাজতে হয়। তোমাকে বেশি সাজতে হবে না। একদম শুকনো মুখে থাকলে লোকে নানান কথা বলবে। নতুন আত্মীয়রা কি ভাববে প্লিজ না করিও না।
…..
মুনতাহার শাশুড়ী সকাল হতে না হতেই সাইমুনের রুমে গেলো। ছেলেটার মতিগতি ভালো লাগছে না। না জানি তীরে এসে তরী ডুবে যায়।
সাইমুন বালিশে হেলান দিয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন। যেন জীবনের হাজার হিসেব মিলাতে ব্যাস্ত।
— তুই কি শুরু করছিস বাবা?? শেষ বয়সে কি আমারে অপমান করাবি??
— কেন মা কি করলাম!
— তুই মুনতাহার ঘরে কেন গেছিস। ও যেহেতু মেনে নিছে সব ভালো ভালোয় হচ্ছে তাহলে আবার এসব কেন?? তুই কি বিয়ে টা করতে চাস না!!
— না মানে মা…. ও তেমন কিছু না। তুমি ভেব না তুমি যেভাবে ভেবেছ সেভাবে সব কিছু হবে। আমি তো৷ তোমার কথার অবাধ্য হতে পারি না।
— ঠিক আছে সময়মত রেডি হয়ে যাস। জুমার আগে ওদের ওখানে যেতে হবে। নামাজ পড়ার পরে কাবিন হয়ে যাবে।
কাবিনের কথা টা সাইমুনের তীরের মত লাগলো । অজানা কষ্ট মন টাকে গ্রাস করে ফেলছে। সত্যি কি সারাজীবনের জন্য মুনতাহা কে হারিয়ে ফেলছে!
…..
সবাই খুব সুন্দর করে সাজছে। কে কোন জামা পরবে কি গহনা পরবে ঠিক করছে। কেউ একবারের জন্য মুনতাহার খবর নেয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি।
মুনতাহা পাথর হয়ে গেছে। চুপ করে কাজ করে যাচ্ছে। কার কি লাগবে সব দিকে খেয়াল রাখছে। যতটুকু পারছে নিজেকে কাজে ব্যাস্ত রাখছে। ব্যাস্ত থাকলে কান্না আসবে না। কান্না মানুষকে ক্রমশ দূর্বল করে।
সাইমুনের মুখামুখি ১-২ বার পড়েছে। একবারও সাইমুনের চোখের দিকে তাকায়নি। ও জানে সাইমুনের চোখের দিকে তাকালে অবহেলিত চোখ দুটো নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।
অবহেলা ভীষণ ভয়ংকর জিনিস, জীবন্ত মানুষ কে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপন মানুষের অবহেলা টুকু যথেষ্ট।
সবাই বিয়ে বাড়িতে যাবার জন্য বের হচ্ছে। মুনতাহার শাশুড়ীর সাহস হয়নি মুনতাহা কে বলার জন্য চল আমাদের সাথে।
জীবন নামে ছোট্ট নৌকায় মানুষ প্রতিনিয়ত কষ্টের সাগরে ডুব দেয়। কেউ কেউ সেখান থেকে উঠে জীবন টাকে নতুন আলোয় উজ্জীবিত করতে পারে আবার কেউ অথৈয় সমুদ্রে তলিয়ে যায়
সাইমুন এলোমেলো উস্ক শুস্ক চুলে বের হবার আগে মুনতাহার দিকে তাকালো। মুনতাহার চোখ আজ বড্ড ক্লান্ত। এক গুচ্ছ মন খারাপের কালো মেঘ মুনতাহার মনের আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।
মুনতাহা সাইমুনের দিকে চিরুনি এগিয়ে দিয়ে,,
— বিয়ে কর‍তে যাচ্ছ। খুনের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়ে না। নতুন বর কে এলো মেলো চুলে মানায় না।
সাইমুন চুপ,, কোন উত্তর দিলো না। জীবনে কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায় না, কিছু ভুলের সমাধান হয় না।
মুনতাহা এক সমুদ্র কষ্ট নিয়ে শেষবারের মত সাইমুনের দিকে তাকিয়ে আবার নিচের দিকে তাকালো। বেশিক্ষণ তাকানোর মত মানসিক শক্তি খুঁজে পেলো না।
ওদের বিদায় দিয়ে মুনতাহা ওয়াশ রুমে গিয়ে ঝর্ণা ছেড়ে গায়ের যত জোর ছিলো পুরোটা দিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো….
তুমি সত্যি আমার ভালোবাসা কে হারিয়ে দিয়ে জিতে গেলে। তোমাকে কাছে পাওয়ার কোন উপায় আর রইলো না, আমি বাস্তবতার কাছে আজ বড্ড অসহায়।
মনের কোথাও এক কোণেফপআশার আলো ছিলো তুমি যাবে না। কিন্তু আমি ভুল আমি তোমায় আপন করতে পারিনি। আপন মানুষ কখনো ছেড়ে যায় না ভালোবাসায় আগলে রাখে।
.
.
অবন্তিকার চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়ছে। ভাবছে কিভাবে কবুল বলবে। সত্যি কি পারবে আহানাফ কে ভুলে থাকতে!
…..চলবে….