খুব যতনে ভালোবাসি তাঁরে

খুব যতনে ভালোবাসি তারে ! Part- 03

এবার মায়ের সামনে হাঁটু ঘেড়ে বসে ছলছল চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম,

-একটু আগেই তানহার ফুফু কল দিয়েছিলেন। উনি বলেছেন তুমি চাইলেই এখন কথা বলে সব পাকাপাকি করে ফেলতে পারো। আর এখন কিনা তুমি বলছো মামা আমার জন্য মেয়ে দেখেছে! এটা কি করে হয় মা?

মা আমার দিকে চেয়ে একটা রহস্যের হাসি দিয়ে বললেন,
-কিরে, তানহার প্রতি কি এতটাই টান জন্মে গেছে তোর?

আমি চুপচাপ নিচের দিকে চেয়ে রইলাম। বললামনা কিছু। এবার মা বললেন,

-তোর মামা বলেছে, ঐ মেয়েটা নাকি অনেক সুন্দরী। তোকে নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা দিবে। আর জিনিসপত্র তো দিবেই। এতকিছু শুনে আমি মুখের উপর না করতে পারিনি। এবার তুই ঠিক কর কি করবি।

আমার মাথার রক্ত গরম হয়ে গেলো এবার। মাকে বললাম,

-কি বললে এটা! মামা কি আমাকে নিয়ে ব্যবসা করতে চাইছে? পাঁচ লক্ষ টাকা দিবে মানে? আমি কি যৌতুক নিয়ে বিয়ে করবো? মা তুমি কি করে মামার এসব কথার পরও চুপ করে ছিলে? কিছু বলোনি কেন মামাকে? দাঁড়াও, আমিই কল দিয়ে জিজ্ঞেস করছি।

এই বলে ফোনে মামার নম্বরটি বের করতে যাব এমন সময় মা আমাকে আটকে দিয়ে বললেন,
-হয়েছে হয়েছে। কাজ হয়ে গেছে। এই নে ধর, কথা বল তানহার সাথে।

মা আমার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন আর সাথে সেই রহস্যমাখা হাসি। আমি অবাক হলাম কিছুটা। বললাম,

-তানহার সাথে কথা বলবো বলতে! মানে কি?

মা,
-তোর সাথে তানহার ফুফু কথা বলার পর তানহা কল দিয়েছিলো আমায়। ও কাল আমার নম্বর রেখেছিলো। আমি বসে বসে এতক্ষণ ওর সাথেই কথা বলছিলাম। এমন সময় তুই চলে আসলি। তাই তোকে একটু বাজিয়ে তানহাকে শুনিয়ে দিলাম তুই যে আমার সোনার টুকরো ছেলে। নে ধর, ও লাইনেই আছে, কথা বল!

আমার মা যে এতোটাও ডেঞ্জারাস সেটা আমি আগে জানতামনা। বাবারে বাবা! মানতেই হবে তাঁকে। আমার গলায় একদম পানি ছিলোনা। মায়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে এলাম। একেবারে নিজের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পরলাম।

আমি,
-আসসালামুআলাইকুম।

তানহা,
-ওয়ালাইকুমুসসালাম। কি করছেন এখন?

আমি,
-এইতো শুয়ে আছি। আপনি?

তানহা,
-বসে আছি। নামাজ পড়েছিলেন?

আমি,
-জ্বী।

তানহা,
-ভেরি গুড। নাস্তা করা হয়েছে?

আমি,
-জ্বী, চা-নাস্তা করেছি।

তানহা,
-আমি আসলে ভাবতেও পারিনি যে হুট করে মা আপনার এতবড় একটা পরীক্ষা নিবেন। আসলেই আমি জানতামনা এটা। উনি শুধু বলেছিলেন আমি যেন লাইনে থাকি। এটুকুই। পরে তো আপনাদের মা ছেলের মধ্যে যা যা কথা হয়েছে আমি শুধু এপাশ থেকে শুনেছি। তবে, আপনার পার্সোনালিটি সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি এটা ভেবে খুবই খুশি যে খুব শীঘ্রই আমি আপনার গর্বিত অর্ধাঙ্গীনি হতে চলেছি। যদি আল্লাহ্ চান তো।

আমি,
-ইনশাআল্লাহ্ দেখা যাক। তা এখনি কি মাকে কথা বলিয়ে দিব আপনার ফুফুর সাথে?

তানহা,
-হুম, দিতে পারেন। আচ্ছা আমি ফুফুর কাছে ফোনটা নিয়ে যাচ্ছি। আপনি মায়ের কাছে যান।

আমি,
-আচ্ছা ঠিক আছে।

এবার মায়ের কাছে ফোনটা নিয়ে গিয়ে বললাম,
-এই নাও, তানহার ফুফুর সাথে কথা বলো। উনার কাছে ফোন নিয়ে যাচ্ছে ও।

মা আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কানের সাথে লাগিয়ে বসে রইলেন। অপেক্ষা করছেন অপাশ থেকে রেসপন্সের। আমি আর মায়ের পাশে থাকলামনা চলে গেলাম ওয়াশরুমের দিকে।

মিনিট পনেরো পরে গোসল সেরে বেরোলাম আমি। সকালে গোসল করে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি বের হয়েছি তা টের পেয়ে মা দরজায় এসে নক করলেন। যদিও দরজাটা লক করা ছিলোনা। এটাই নিয়ম। কারণ বাইরে থেকে তো আর বুঝা সম্ভব হয়না যে ভেতরে থাকা মানুষটি ঠিক কোন অবস্থায় আছে। এজন্য আমাদের সকলেরই উচিৎ নিজের ঘরে হোক বা অন্যের ঘরে কোথাও কারোর রুমে হুট করে অনুমতি না নিয়ে ঢুকে না পড়া। সালাম দেয়া, কলিংবেল বাজানো, দরজায় নক করা, মোটকথা, যখন যে পরিস্থিতিতে যেটা করতে হয় সেটা করা। আর পরপর তিনবার নক করার পরও কোন সাড়াশব্দ না পেলে ফিরে যাওয়া। মা এবার দরজায় নক করে আমার অনুমতির অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। বললাম,

-এসো ভেতরে।

মা এবার ঢুকলেন আমার রুমে। তাঁর চেহারায় আনন্দের ছাপ স্পষ্ট। বললাম,
-কি ব্যপার, হাসছো যে!

মা,
-আগামী শুক্রবার তারিখ ঠিক করেছি। ভালো করিনি কি?

আমি,
-আলহামদুলিল্লাহ্। ভালো করবেনা? আবার সেটা তুমি! খুব ভালো করেছ। এখন কিভাবে কি হবে না হবে সেটা বলো শুনি।

মা বলতে লাগলেন,
-আজকে ফোনে সবাইকে জানিয়ে দিলেই হবে। আর কেনাকাটা যা করতে হয় সেটা তো তোকেই করতে হবে। আর তোর মামাকে কল দিচ্ছি এখন। তোর মামা আসলে সেই এখানে মেহমানদারির সব ব্যবস্থা করবে। তুই কি বলিস!

আমি,
-দেখো তুমি যেভাবে যা ভালো মনে করো।

মা,
-আচ্ছা ঠিক আছে। আর শোন, তানহার থেকে জেনে নিস তো ওর ঠিক কি কি পছন্দ বা অপছন্দ। পরে জানাস আমাকে।

আমি,
-তোমাদের বিয়ের সময় কিভাবে বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা করা হয়েছিলো বলতো মা!

আমার মুখে এমন প্রশ্ন শুনে মা হাসতে লাগলেন। বললেন,
-আর কি কিভাবে। তোর বাবা তো আমাকে একবার দেখেই একেবারে কাঁত হয়ে গিয়েছিলো। এক টাকাও যৌতুক আনেনি। আমাদের বিয়েতে দেনমোহর ঠিক করা হয়েছিলো পঞ্চাশ হাজার টাকা যা কিনা তৎকালীন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিলো। তোর বাবা সেটা বিয়ে পড়ানোর সময়ই নগদে দিয়ে দেয়। সেই দিনগুলোর কথা কি কখনো ভুলা যায়!

আমি,
-বাবার সাথে বরযাত্রী কতজন গিয়েছিল?

মা,
-গিয়েছিলো পনেরো-বিশজনের মতো। অনেকেই নাকি যেতে চেয়েছিলো কিন্ত তোর বাবাই নাকি তাদেরকে সাথে নেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের সবাইকে বৌভাতের দিন আমার বাড়িতে আমি মেহমানদারি করবো। বরযাত্রায় এত মানুষ গিয়ে তাদের উপর জুলুম করার কোন প্রয়োজন নেই।’

আমি,
-বাহ! চমৎকার! এখন কেমন হয় বাবার সবকিছু যদি তার সন্তানও অনুসরণ করে?

মা একগাল হেসে বললেন,
-যা খুশি করিস। এবার খাবি আয়!

কথাগুলো বলে মা বেরিয়ে গেলেন আমার রুম থেকে। আমারও বেশ চনমনে লাগছে। বিয়ে করবো বিয়ে করবো বলে একটা ভাব চলে এসেছে মনে।

দেখতে দেখতে একটি সপ্তাহ কেটে গেলো। রাত পোহালেই বিয়ে। বিয়েকে ঘিরে তেমন কোন ঝামেলা নেই। নেই এতো চোখ ধাধানো কোন আয়োজন। একেবারে সবকিছুই সাদামাটাভাবে করা হচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের অনেকেই ইতোমধ্যে আমাদের বাড়িতে চলে এসেছেন। মা’ই সবাইকে আসতে বলেছেন। গোটা বাড়ি এতদিন পর আত্মীয়স্বজনদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠলো। শেষ বাবা যখন মারা গিয়েছিলেন সেদিন সবাই এসেছিলো। আর আজ আসলো। আমাদের মানুষের জীবনচক্র আসলে কতইনা অদ্ভুত! আমরা মোট বিশজন যাব বলে তাঁদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। তাই তিনটি গাড়ি ঠিক করা হলো। এগুলো মামাই দেখেছেন। আমি ঐ গায়ে হলুদের নামে অন্যের হাতে গোসল করিনি, হলুদও মাখিনি। করতেও দিইনি কোন রং মাখামাখি। সবকিছু একদম সিম্পলিই হচ্ছে। অবশ্য, এনিয়ে আমার সামনে আপত্তি তুলার সাহস কেউ এসে দেখায়নি। আশা করছি আর কেউ দেখাবেওনা কারণ, ওরা আমায় খুব ভালো করেই চেনে।

সবকিছুই প্রস্তুত। ঘরে আগত আত্মীয় মেয়েলোকরা তাদের সাজসজ্জার বিষয়াবলী নিয়ে ব্যস্ত। এটা তারা করতেই পারে। ঘড়ির কাটা তখন রাত এগারোটায় পৌঁছে গেছে। ছাদে নিরিবিলি একা বসে আছি আমি। ভাবলাম, তানহাকে একটা কল দিলে কেমন হয়। পরক্ষণেই আবার ভাবলাম নাহ, কল দিবনা একটা টেক্সট পাঠানো যাক। কিন্ত কি লিখবো? মনে মনে নিজেকেই নিজে বললাম, ‘কিরে রিয়াদ, কাল যে মেয়েটি তোর বউ হতে চলেছে তাকে তুই কল দিতে আর মেসেজ পাঠাতে এত ভাবছিস! তোকে দিয়ে কিছুই হবেনা। বলদ কোথাকার!’ আবার বলি, ‘নাহ সাহস করে একটা মেসেজ পাঠিয়েই দেখনা কি হয়!’ মনের কথা শুনলাম। দিলাম পাঠিয়ে মেসেজ;

মেসেজে লিখলাম,
-আসসালামুআলাইকুম। সজাগ আছেন কি?

মেসেজ পাঠিয়েই ভাবছি, ইস! কি করলাম এটা! কেন মেসেজটা পাঠালাম। কি না কি ভেবে বসে কে জানে। যদি ভাবে, দেখো, কাল বিয়ে আর আজ এত রাতে মেসেজ পাঠিয়েছে। যেন তার আর তর সইছেনা! আবার নিজেকে নিজে বললাম, কুল রিয়াদ কুল! এত ভয় পেলে চলবে বল! মেসেজ পাঠিয়েছিস বেশ করেছিস এবার ওয়েট কর। দেখ কোন রিপলাই আসে কিনা।

অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি। মিনিট দশেক পার হয়ে গেলেও কোন রিপলাই এলোনা। ভাবলাম, হয়ত ঘুমিয়ে পরেছে ও। হতাশ হলাম কিছুটা। কিন্ত কিছুই করার ছিলোনা আমার। এভাবে আরো বেশ কিছু সময় কেটে গেল। ঠিক করলাম ঘুমোতে যাব এমন সময় টুংটাং শব্দ করে উঠলো ফোনটা। আঁতকে উঠলাম আমি। হাতে ফোনের স্কিনের দিকে তাকিয়েই দেখি তানহা মেসেজ পাঠিয়েছে,

-ওয়ালাইকুমুসসালাম। বান্ধবীরা এসেছে। ওদের সাথেই ছিলাম এতক্ষণ। কি করেন আপনি?

আমি,
-এইতো ছাদে বসে আছি। খেয়েছেন রাতে?

তানহা,
-জ্বী খেয়েছি। আপনি?

আমি,
-জ্বী, খেয়েছি।

তানহা,
-এত রাতে ছাদে বসে কি তারা গুনছেন নাকি?

আমি,
-একা একা কি আর তারা গননা করা যায় বলুন! কেউ থাকলে না একটা কথা ছিলো।

তানহা,
-আচ্ছা, তা তারা গুনে দিলে কি দিবেন শুনি!

আমি,
-এখনই বলতে পারছিনা। কেউ তারা গুনে দিক আগে পরে দেখা যাবে।

তানহা,
-অনেক রাত হয়েছে, যান, ঘুমোন গিয়ে।

আমি,
-আচ্ছা ঠিক আছে। আপনিও।

তানহা,
-আচ্ছা, আল্লাহ্ হাফেজ।

আমি,
-আল্লাহ্ হাফেজ।

অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি। প্রতিটি মানুষের জীবনেই এই দিনটি একটি বিশেষ দিন। বিয়ে, হ্যা বিয়ের দিন। আমাদের খেয়াল হলো জুমার নামাজ পড়বো নেত্রকোনার বড় মসজিদে গিয়ে। সে অনুযায়ী বেলা বারোটার দিকে রওয়ানা হলাম। আমাদের বাড়ি থেকে গাড়ি দিয়ে কেন্দুয়া বাজারে আসতে এক মিনিটও লাগেনা। বাজারে প্রবেশ করবো অমনি ড্রাইভার হার্ডব্রেক চেপে ধরলো। থমকে উঠলাম সবাই। ব্যাপার কি? দেখি, হিজরা সম্প্রদায়ের একদল লোক এসে সবগুলো গাড়িকে ঘেরাও করে ফেলেছে। ছন্দের তালে তালে কি জানি কি সমস্বরে বলছে সবাই আর হাত তালি দিচ্ছে। সাথে থাকা ছোটভাই আতিককে বললাম,

-আতিক, দেখতো নেমে ওরা কি চায়।

আতিক নেমে গিয়ে ওদের সাথে কথা বলে এসে বললো,
-ভাই, ওরা দশ হাজার টাকা দাবি করেছে। না দিলে নাকি গাড়িগুলোকে যেতে দিবেনা। কি করবা?

——–চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *