তোকে চাই

তোকে চাই – Season 2 ! Part- 64

— আজব! এটা কি হলো? আরে এতো রাগ কেনো? কি করেছি আমি? না বললে বুঝবো কিভাবে?
আমার থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন উনি৷ হুট করে ওঠে দাঁড়িয়ে সোফার কাছে এসে দাঁড়ালেন ৷ আমি উনার উপস্থিতিটা প্রবলভাবে উপলব্ধি করতে পারলেও চোখ মেলে তাকালাম না। উনার সাথে কথা বলার বিন্দু মাত্র ইচ্ছেও আপাতত নেই আমার। এখন এই ছোট্ট বুকটাতে বিন্দু বিন্দু অভিমানগুলো পাহাড়ের মতো বৃহৎ আকার ধারন করেছে।। উনি কিছু না বলেই কোলে তুলে নিলেন আমায়৷ খুব সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লেন উনিও। কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,
— আমি জানি জেগে আছো তুমি। কি হয়েছে বলো না? কি করেছি আমি? কি করলে ক্ষমা মিলবে আমার? কিছু তো বলো? এবার কিন্তু টর্চার করবো আমি…রোদদ…

উনার কথায় কোনো হেলদুল হলো না আমার। আমি এখনও আগের মতোই নিশ্চুপ। গলায় উষ্ণ ছোঁয়ার পাশাপাশি একটা তীক্ষ্ণ ব্যাথাও অনুভব করলাম। বুঝতে পারলাম উনার ভাষায় “টর্চার” নামক জিনিসটা এখনই এপ্লাই করতে চলেছেন উনি। আমি চোখ-মুখ খিঁচে ঘুমোনোর চেষ্টা করছি ক্রমাগত। আজকে কিছুতেই হারবো না আমি। কিছুতেই না। এতো এতো অভিমান গলানো কি এতোই সহজ? মোটেও না!
সকাল ৮ টা। আধো আধো ঘুমে চোখ মেলে তাকালাম আমি। কাঁচের জানালা ভেদ করে সকালের সোনালী রোদ খেলা করছে আমার চোখে মুখে। আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসলাম । লম্বা চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে চোখ ফিরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম —– ৮ঃ১০। আশেপাশে শুভ্রকে চোখে পড়লো না। অলস ভঙ্গিতে পা’দুটো মাটিতে রাখতেই শরীরের দুর্বলতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো ৷ মাথাটাও ভারি ভারি লাগছে খুব। কোনোরকম ওঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে ভাবতে লাগলাম, “আচ্ছা? আমি কি অসুস্থ?হঠাৎ হঠাৎ শারীরিক দুর্বলতার মানে কি? শুভ্রকে কি বলবো?” এমন সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতেই ফ্রেশ হয়ে একদম নিচে চলে গেলাম আমি। ড্রয়িংরুমে আজ গমগমে ভাব। সাহেল ভাইয়া আর নাবিলা আপুকে পেয়ে সবাই যেন গল্পে মেতে উঠেছে আজ। আমাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন সাহেল ভাইয়া। নাবিলা আপুও মিষ্টি করে হাসলেন। উনার হাসির উত্তরে আমিও এক টুৃকরো হাসি ফিরিয়ে দিতেই পাশ থেকে সাহেল ভাইয়া বললেন,
— গুড মর্নিং সানশাইন?
— গুড মর্নিং ভাইয়া।
মামু আমাকে পেয়েই তার বিরাট পরিকল্পনার সারমর্ম শুনিয়ে দিলেন আমায়। এখন অব্দি এই বাড়িতে আমিই সবচেয়ে ছোট প্রাণী৷ শশুড়বাড়ির সবাই আমায় বউ কম বাড়ির বাচ্চায় বেশি মনে করেন। তাই আমাকে পুরো পরিকল্পনাটা শুনিয়ে চমকে দেওয়াটা মামুর কাছে খুবই উপভোগ্যকর বিষয়। আমি মামুর কথা বেশ মনোযোগ সহকারে শুনলাম এবং চমকানোর চেষ্টাও করে চললাম ক্রমাগত৷ মামু আজ বিকেলে ফ্যামেলি গেট টুগেদারের ব্যবস্থা করেছেন। শুভ্র আর সাহেল ভাইয়ার বন্ধুরা,আমার ফ্যামিলি,মামানির আত্মীয় স্বজন আর সাহেল ভাইয়ার বাবা-মা এই কয়েকজন নিয়েই এই আয়োজন। মামুর ধারনা ব্যাপারটা দারুন হবে। অনেকদিন পর বাড়িতে একটা পিকনিক পিকনিক ভাব চলে আসবে। আমিও মাথা হেলিয়ে স্মিত হেসে সায় জানালাম। এমন সময় কোথা থেকে শুভ্র এসে ধপ করে বসে পড়লেন আমার পাশে। আমার ওড়নার আঁচল টেনে নিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে মামুকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
— বাবা? যা যা আনতে বলেছিলে সব রেডি। পুরোদস্তুর বাজার করেছি আজ। গিয়ে চেইক করে নাও। এব্রিথিং ইজ ওকে ওর নট!
মামু উৎফুল্ল মুখে উঠে যেতেই সবার দৃষ্টির অগোচরে কোমর চেপে ধরলেন উনি। কাঁধে নাক ঘষতে ঘষতে বলে উঠলেন,
— গুড মর্নিং রোদপাখি।

আমি ফ্রিজড হয়ে বসে আছি। এতোগুলো মানুষের সামনে এমন একটা ব্যবহার একমাত্র উনার পক্ষেই সম্ভব। অভ্র ভাইয়া আর সাহেল ভাইয়া মিটিমিটি হাসছেন। কিছুক্ষণের মাঝে নাবিলা আপুও যোগ দিলেন তাতে। রাগে গা টা জ্বলে যাচ্ছিলো আমার। অভ্র ভাইয়া নিশ্চয় কোনো বেফাঁস কথা বলার জন্যই রেডি হচ্ছেন এবার? দুই ভাই তো এক টাইপ —— মুখ ফাঁটা!
কথাটা ভেবে নড়েচড়ে উনার হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে যেতেই সোফায় গা এলিয়ে দিলেন উনি। ওরনার একপাঁশটা আকঁড়ে ধরেও এদিক ওদিক তাকিয়ে ছেড়ে দিয়ে আমতা আমতা করে বললেন,
— এক কাপ কফি দিও রোদপাখি, প্লিজ!
আমি চুপচাপ রান্নাঘর থেকে এক কাপ কফি এনে উনার সামনের টেবিলে রাখলাম। উনি খেয়াল করলে বুঝতে পারতেন আমি উনার সাথে কাল রাত থেকে কথা বলছি না। আচ্ছা? ব্যাপারটা কি উনি খেয়াল করেছেন? হয়তো না, উনার মুখ দেখে তো আপাতত তাই মনে হচ্ছে আমার। সবাই বিকেলের দিকে আসার কথা হলেও ১২ টার মাঝেই রোহুন-সাব্বির ভাইয়ারা এসে হাজির। ১ টার দিকে চিত্রা আর শিশির স্যারও চলে এলেন চুপচাপ। শুভ্রর বড় খালা,উনার মামু, আদিব ভাইয়া আরো কিছু কাজিন এসে জুটলো দুপুর দুটোর দিকে। বিকেল চারটার মধ্যে সারা বাড়ি হৈ-হুল্লোড়ে ভরে উঠলো। এমনিই শরীরটা খারাপ তারওপর এতো মানুষের চেঁচামেচিতে কিছুক্ষণেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম আমি। তবুও হাসিমুখে থাকতে হলো সারাটাক্ষন। সন্ধ্যার দিকে সবার নাস্তার ব্যবস্থা করতে মামানিকে হেল্প করছিলাম। আপু অসুস্থ না থাকলে রান্না ঘরে আসার প্রয়োজনই পড়তো না আমার কিন্তু এখন সিচুয়েশনটায় ভিন্ন। রান্না ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে আছেন শুভ্রর বড় খালা। আমি শুভ্রর বউ ব্যাপারটা উনার ঠিক হজম হচ্ছে না। শারীরিক অসুস্থতা, শুভ্রর খালার ঝাঁঝালো কথায় মানসিক চাপ সবদিক থেকে যেন ফাঁপড়ে পড়ছিলাম আমি। বাসায় থাকলে কেঁদে কেঁটে বিশ্রী অবস্থা করা আমি আজ কতোটা শান্ত কথাটা ভেবে খানিকটা চমকালাম আমি। শুভ্রর বড় খালার কথার তোড়ের মাঝেই রান্নাঘরে ঢুকলেন শুভ্র। চুলগুলো থেকে টুপটাপ পানি পড়ে চলেছে হয়তো শাওয়ার নিয়েছেন। শুভ্র রান্না ঘরে ঢুকতেই বড়খালা গদগদ কন্ঠে বলে উঠলেন,
— আরে শুভ্র? তুই রান্নাঘরে কি করছিস বাবা? কিছু লাগবে?
— হ্যাঁ লাগবে।
— তা কিছু লাগলে তো তোর বউকেই বলতে পারতিস। বউ কি সাজিয়ে রাখার জন্য এনেছিস নাকি? বউ থাকতে আমাদের ছেলেটাকে কেন রান্নাঘরে আসতে হবে শুনি? আজকালকার মেয়েদের মধ্যে কোনো আক্কেল আছে নাকি? আচ্ছা, ওসব থাক। কি লাগবে তোর?
— বউ লাগবে। বউ নিতে এসেছি। এভাবে তাকে রান্নাঘরে আটকে রাখলে তো তোমাদের ছেলেদের রান্নাঘরে আসতেই হবে খালামণি। রোদপাখি? রুমে চলো। আমার ব্ল্যাক টি-শার্ট খুঁজে পাচ্ছি না। ঘড়ি খুঁজে পাচ্ছি না। চলো তো….
আমি উনার দিকে তাকালাম না। সবজি কাটার ছুঁড়িটা পাশে রেখে রান্নাঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। পা’দুটো কেমন একটা টলছে আমার৷ শরীরটা যে কেন এমন ভারি লাগছে কে জানে? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের দিকে এগুতেই পেছন থেকে খালার তাচ্ছিল্যভরা কন্ঠ কানে এলো,
— বলি কি রেনু্, ছেলে তো তোর বউয়ের আঁচল ধরে ফেলেছে রে। কিছু একটা কর পরে দেখা যাবে তোর ছেলে অন্যের মেয়ের হাতের মুঠোয় বন্ধী হয়ে গেছে।
— আপা? রোদ ওর বউ। আর আমি ওর মা। এই দুটো সম্পর্কের গভীরতা আমার ছেলে বুঝে। আমাদের দু’জনের স্থান এক জায়গায় নয় যে আমাদের মাঝে প্রতিযোগীতা হবে। আমরা প্রতিদ্বন্দি নয় আপা। আমা..
মামানীর কথাগুলো আর কানে এলো না আমার। চুপচাপ রুমে ঢুকে আলমারি থেকে উনার টি-শার্ট বের করে দিলাম। উনি টি-শার্টের সাথে থ্রি-কোয়াটার প্যান্ট পড়ে আছেন। আমি শুধু শীতল দৃষ্টিতে দেখলাম কিছু বললাম না। সারা বাড়িতে মেহমানে ভর্তি আর উনি থ্রি-কোয়াটার পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমার কাজ শেষ করে রুম থেকে বের হতে নিতেই আমার হাতটা চেপে ধরলেন উনি। করুণ গলায় বললেন,
— তুমি ঠিক আছো তো রোদ? তোমাকে কেমন যেন ফ্যাকাশে লাগছে।
আমি উনার দিকে ফিরে তাকালাম। ঘন কালো চোখ-দুটোতে ছোট বাচ্চাদের মতো একরাশ অভিমান। আমি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে হাতটা ছাড়িয়ে নিচে নেমে এলাম।পেছনে না তাকিয়েই বুঝতে পারছি মুখ ফুলিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন উনি। এমন চাইল্ডিশ চাহনী দেখে কি রেগে থাকা যায়?রাত আটটার দিকেই সাব্বির ভাইয়ারা ছাদে গদি বিছাতে শুরু করলেন। আজকের রাতটা ছাদেই কাটাবে সবাই। বড়রা নয় শুধু ছোটদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ছাদ। সোফায় বসে বসে উনাদের কর্মকান্ড দেখছিলাম আমি আর নাবিলা আপু। এরা সব বন্ধুরা একসাথে থাকলে মনে হয় সবকটা উঠতি বয়সের কিশোর অথচ সবাই-ই এখন সাবলম্বী। নাবিলা আপু সেদিকে তাকিয়ে একটু হেসে নিয়েই বলে উঠলেন,

— তোমার বর হয়তো ঠিকমতো ইঞ্জয় করতে পারছে না। বারবার তোমার দিকে তাকাচ্ছে। মান- অভিমান চলছে নাকি তোমাদের?
আমি হালকা হাসলাম। নাবিলা আপু এই হাসির অর্থ বুঝলেন কি না জানি না। উনিও মিষ্টি করে হেসে বলে উঠলেন,
— শুভ্রর চঞ্চলতা একফোঁটাও কমে নি। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখনও শুভ্র এমনই চঞ্চল ছিলো। ক্লাসের সবার সাথেই সখ্যতা ছিলো তার শুধু মেয়েরা বাদে। কারণ কোনো মেয়ের সাথেই তেমন একটা কথা বলতে দেখি নি আমি। তবে যার সঙ্গেই কথা বলতো মনে হতো কতোদিনের চেনা। এনিওয়ে, তোমাকে একটা মজার ঘটনা বলি। একবার,ক্লাস টেনে স্কুল থেকে আমাদের ট্যুরে নিয়ে গেলো। ট্যুরটা ছিলো সিলেটে। চা বাগান দেখা শেষ করে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠছি ঠিক তখনই শুকনোর মধ্যে পা পিছলে ধাম করে পড়ে গেলাম আমি। তখন তো বাচ্চা ছিলাম, দিলাম ভ্যা করে কেঁদে। যদিও ব্যাথার জন্য নয় লজ্জায় কেঁদে উঠেছিলাম সেদিন। শুভ্র আর সাব্বির ছিলো আমার ঠিক পেছনে। আমাকে কাঁদতে দেখেই শুভ্র ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
— এই? বাচ্চাদের মতো কাঁদছিস কেন?
আমাকে বলা ওটায় ছিলো তার প্রথম কথা। তবু এমনভাবে বলেছিলো যেন কতো বছরের বন্ধু আমার। সেদিন আমিও মুখ ফুলিয়ে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলেছিলাম,
— আমি তো বাচ্চায়। তোর মতো বুড়ো নাকি যে কাঁদবো না।
সেই থেকেই শুরু হলো। শুভ্র হাসতে হাসতে বলে উঠলো,
— ও আচ্ছা,তুই তো নাব্বু বেবি। ইশশ রে, ওই ওই তোদের মধ্যে এই বেবিটা কার রে? তুলে নিয়ে যা তো। এমনি একটা বেবিকে কেউ ফেলে যায়? নাব্বু বেবি? ওঠে পড়ো, ওঠে পড়ো।
সেদিন থেকেই পুরো স্কুলে আমি হয়ে গেলাম “নাব্বু বেবি”। হা হা হা
উনার কথায় হেসে উঠলাম আমি। হাসিমুখেই বলে উঠলাম,
— সাহেল ভাইয়াকে কি তখন থেকেই চিনেন?
— আরেহ না। আমি শুভ্রর সাথে শুধু নাইন আর টেন এই দু’বছর পড়েছি। এই দু’বছর সাহেল আমাদের সাথে ছিলো না। কোনো একটা কারণে অন্য কোনো স্কুলে ট্রান্সফার হয়েছিলো সে। তবে আমি ওকে দূর থেকে দেখেছিলাম। শুভ্রর সাথে প্রায়ই রাস্তাঘাটে দেখতাম ওকে। দু’জনের ড্রেস আপ প্রায় সময়ই সেইম হতো। আমি তো ভেবেছিলাম ওরা টুইন। পরে শুনি ওরা বেস্ট ফ্রেন্ড। আর সাহেল আমাকে এয়ারপোর্টেই প্রথম দেখে। শুভ্রর উপর সব মেয়েরাই ক্রাশড ছিলো বাট আমার তো শুভ্রকে দেখেই ভয় লাগতো কি পরিমাণ দুষ্ট ছিলো বাবা! ওকে সামলাও কিভাবে বলো তো? আমি সাহেলের উপর ক্রাশড ছিলাম। যদিও ওর নামটাও জানতাম না। পরবর্তীতে যখন কোলকাতায় চলে যাই তখন ফেসবুকে স্ক্রুল করতে করতে একদিন সাহেলের আইডি চোখে পড়ে তখনই নামটা জেনেছিলাম আমি। তারপর হুট করেই এতোবছর পর এয়ারপোর্টে ওর সাথে দেখা। আমি দৌড়ে গিয়ে বলেছিলাম,
— ” এক্সকিউজ মি? আপনি সাহেল রাইট?”
আমার কথায় কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো সাহেল আর আমি বোকার মতো হাসছিলাম। সাহেল আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নিয়ে বলেছিলো,
— ” সরি! আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। তবে আপনার কিছু কোয়ালিটি আমার খুবই পরিচিত। আপনাকে কি আমি চিনি?”
সাহেলের কথায় থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম আমি। ওর কথার আগা মাথা কিছু না বুঝেই একটা হাসি দিয়ে বলেছিলাম,
— ” আমি নাবিলা আহসান। শুভ্রর ওল্ড ফ্রেন্ড। আপনি তো শুভ্রর বেস্ট ফ্রেন্ড তাই না?”
আমার কথায় সাহেল গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে গম্ভীর মুখে বলে উঠেছিলো,
— “প্লিজ স্টপ লাফিং। এই হাসির জ্বালা মেটাতেই এতোদূর এসেছি। প্লিজ হাসবেন না।”
আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম,
— মানে?
— মানেটা সিম্পল, বিয়ে করবেন আমায়? উইল ইউ মেরি মি?
আমি তো জাস্ট তব্দা লেগে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এমন কোনো সিচুয়েশনে পড়ার কথা কখনো কল্পনাতেও ভাবি নি। তখন মাথায় কি ঢুকেছিলো কে জানে? বোবার মতো দাঁড়িয়ে মাথা নেড়েছিলাম শুধু। যার অর্থ, আমি আপনাকে বিয়ে করবো।
এটুকু বলেই হেসে উঠলেন নাবিলা আপু। উনার সাথে তাল মেলালাম আমিও৷ কৌতুহলী হয়ে বলে উঠলাম,
— ওয়াও, সো এক্সাইটিং। তারপর কি হয়েছিলো?
— তারপর? আমার মাথা নাড়ানো দেখে আরো গম্ভীর হয়ে এলো সাহেলের মুখ। আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
” কিন্তু আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। ”
সাহেলের কথায় আবারও অবাক হয়েছিলাম আমি। অন্য কাউকে ভালোবাসলে আমাকে বিয়ে করতে চাওয়ার মানে টা কি? অদ্ভুত! আমার মনের ভাব হয়তো সাহেল বুঝতে পেরেছিলো। ঠান্ডা গলায় বলেছিলো,
“যাকে ভালোবাসি সে আরেকজনের বউ। ব্যাপারটা খুবই কমপ্লিকেটড। তুমি কি শুনবে? শুনার পর যদি তোমার মনে হয় আমি ভুল তাহলে ঠিক আছে। আর যদি মনে হয় আমি ঠিক তাহলে তুমি রাজি না হলেও আমি তোমাকেই বিয়ে করবো। সরি টু ছে, দরকার পড়লে জোড় করেই বিয়ে করবো।”
বিশ্বাস করো রোদ, সেদিন আমি শুধু “হা” করে তাকিয়েই ছিলাম। একটা অপরিচিত মেয়েকে সে জোড় করে বিয়ে করার কথা বলছে। অদ্ভুত!!
নাবিলা আপুর বিয়ের গল্প শুনে যেন শরীর খারাপ ভাবটায় চলে গেলো আমার। খুশি হয়ে বলে উঠলাম,
— তারপর? তারপর?
নাবিলা আপু হেসে উঠলেন। আমার নাক টেনে বললেন,
— যেমন বর তার তেমন বউ। দু’জনেই কেমন বাচ্চা বাচ্চা। (হালকা হেসে) তারপর আর কি? দু’জনে একটা কফি শপে বসলাম। টানা দু’ঘন্টায় সে সবকিছুই খুলে বললো আমায়। সত্যি বলতে আগে তো শুধু দেখে প্রেমে পড়েছিলাম কিন্তু এবার ওর কথা বলার ভঙ্গি, ওর বলা কাহিনী সব মিলিয়ে রীতিমতো প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগলাম আমি। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিলো এই ছেলের দশটা বউ থাকলেও আমি শুধু এই ছেলেকেই বিয়ে করবো। হা হা হা। ওর সোজাসাপ্টা কথাগুলোই আরো বেশি পাগল পাগল করে তুলেছিলো আমায়। কথা শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে যখন বলেছিলো,” বিয়ে করবা আমায়? নাকি কিডন্যাপ করে বিয়ে করবো? দেখো, এবার আর ছাড় দিবো না আমি। ডিরেক্ট কোর্টে গিয়ে আমায় বিয়ে করবা তারপর বাসায় যাবা নয়তো এখানেই বসে থাকতে হবে আমার সামনে। গট ইট?” তখনই আমি ডিসিশন নিয়েছিলাম এই ছেলে হাজার মেয়েকে ভালোবাসলেও ওকেই আমার চাই। চাইই চাই। একটা মজার ব্যাপার কি খেয়াল করছো রোদ?
আমি জিগ্যেসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
— কি আপু?
— শুভ্র আর সাহেল দু’জন কিন্তু অনেকটাই এক টাইপ। হাই এন্ড লো। একজনের মেজাজ অলওয়েজ হাই থাকে তো আরেকজনের মেজাজ অলওয়েজ লো। আমাদের দু’জনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেইম৷ হাই এন্ড লো। তুমি অলওয়েজ হাই আর আমি অলওয়েজ লো। এক্চুয়েলি আমি না রাগই করতে পারি না। রাগটা আমার আসেই না। কেন যে কে জানে?
কথাটা বলে ঠোঁট উল্টালেন উনি। দু’জনে দু’জনের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকেই হুট করে গলা ছেড়ে হেসে উঠলাম। আমাদের দু’জনের হাসির শব্দে সবাই আমাদের দিকে ফিরে তাকালো। সবার চোখেই মুগ্ধতা। আর আমাদের চোখ-মুখে আনন্দ। একঝলক সুখময় আনন্দ।
#চলবে…