ও আমায় ভালোবাসেনি

ও আমায় ভালোবাসেনি !! Part- 06

.দু বছরে বিশেষ কিছু বদলায়নি শুধু সবকিছু উন্নত হয়েছিলো ।
ফুপ্পি স্ট্রংলি ব্যবসায় হাত লাগিয়েছিলেন , বেশ সফলতা লাভ করছিলেন তিনি ।
আমিও স্কুল চেইঞ্জ করেছিলাম আসলে করেছিলাম না করানো হয়েছিল এবং এই শুভ কাজটা করিয়েছিলেন রাইদ ভাই ।
এব্রডে গিয়েই উনি বাসায় ফোন দিয়ে বলেছিলেন মিথিকে আজই স্কুল চেইঞ্জ করাবে , যত টাকা লাগে লাগুক!
জনাবের কথাই শেষ কথা তো কি আর করার!
নতুন স্কুলে এসে বিশেষ পরিবর্তন টা আমার মাঝে হয়েছিল এটা আমি উপলব্ধি করতে পারছিলাম ।
এই স্কুলের বান্ধবী রা আরো বেশী স্টাইলিশ ছিলো , এদের বয়ফ্রেন্ড এর সংখ্যাও স্বভাবত বেশী আর সবথেকে খারাপ একটা জিনিস এদের হাতে ফোন ছিলো ।
আমাদের ক্লাসের ম্যাক্সিমাম ছেলেমেয়ে একসাথে মিলে বসে অশ্লীল ভিডিও দেখতো ।
আমার সর্বোচ্চ খারাপ একটা গুণ হলো আমি মানুষের খারাপ গুণগুলি আয়ত্ত করতে পারি এবং স্বভাবতই আমি করলাম ।
তবে আমি ঐ শ্রেণীর সাথে মিশলাম না যারা সত্যিকার অর্থেই খারাপ বরং ঐ শ্রেণীর সাথে মিশলাম যারা লেখাপড়া এবং আদারস সাইড ব্যালেন্স করে চলতে পারে ।
অর্থাৎ সিমিদের গ্রুপ , ওদের গ্রুপে তিনজন মেয়ে সিমি , শায়লা আর মাইশা ।
এরা অনেক স্টাইলিশ এবং ক্লাসি ছিলো তার পাশাপাশি পড়াশোনাতেও এগিয়ে ।
তিনজনই ফার্স্ট, সেকেন্ড এবং থার্ড হতো প্রতিবার ।

সিমি সবচাইতে বেশী মিশুক ছিলো তাই ওর সাথেই আমার বন্ধুত্ব বেশী গাঢ় হয়েছে ।
খুব ভালো সময় কাটতে লাগলো আমার ওদের সাথে ।
প্রতিদিন ক্লাস , টিফিন টাইমে আড্ডা আর ছুটির পর লাইব্রেরিতে গিয়ে অকারণে বসে থাকা ।
শায়লা ছিলো পড়ুয়া , ওকে বই পড়ার সময় ডিস্টার্ব করা আমাদের অধিকার ।
ওদের সাথে মেশবার পর আমি কার্লি চুল রিবন্ডিং করে ফেললাম , কালো চুলের রঙ পাল্টে হলো হালকা বাদামী ।
তো সেইবার ফুপার মৃত্যুবার্ষিকীর প্রায় এক সপ্তাহ আগে সন্ধ্যপবেলা রাইদ ভাই ফুপ্পির সাথে ভিডিও কলে কথা বলছিলেন ।
আমি মাত্র কোচিং ক্লাস থেকে ফিরেছি , দেখছি ফুপ্পি কথা বলছেন ।
নাচতে নাচতে ফুপ্পির পাশে বসে বললাম_ ফুপ্পিইই কি করোওও?
ফুপ্পিও হেসে বললেন _তোর রাইদ ভাইয়ার সাথে কথা বলি , তুইও আয়?
আমি কেনো জানি গেলাম না সামনে , বললাম নাহ খুব টায়ার্ড পরে কথা বলবোনে ।
রুমে যাবার সময় সাইড থেকে শুধু একবার উঁকি মারলাম আর এটাই হলো কাল ।
রুমে ঢোকার আগেই ফোনে রাইদ ভাই জোরে করে বললেন_ আম্মা ওরে এদিকে আসতে বলো ত?
আমিও শুনেছিলাম কিন্তু ভয়ে যাইনি , জলদি রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছি ।
ফুপ্পি যখন এসে ডাকলেন তখন বললাম_আমি তো গোসলে , তুমি কথা বলো আমি একটু পরে নাহয়..!
ফুপ্পি ঠিকাছে বলে চলে গেলেন ।

আমিও ঐ মুহুর্তের জন্য হাফ ছেড়ে বাঁচলাম ।
ফ্রেশ হয়ে এসে ফোনে গেম খেলছিলাম তখন ডুয়ো তে কল আসে , রাইদ ভাইয়ের নাম্বার “প্রিয়” দিয়ে সেভ করা ছিলো ।
স্ক্রিনে প্রিয় নামটা দেখে আমি শুকনো বিষম খেলাম ।
কি আশ্চর্যের কথা!
ভয়ে তো আমি কল রিসিভ করতে পারছি না ।
একবার বাজতে বাজতেই কল কেটে গেলো এবং আবার কল আসলো ।
দ্বিতীয় বার আমি ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করলাম ।
ফোন রিসিভ করা মাত্রই বিশাল এক ধমক_ “ফোন পেয়ে নিজেকে হিরোইন ভাবতে শুরু করে দিছিস? কল করার জন্যও এপয়েন্টমেন্ট নেয়া লাগবে সবাইকে!”
আমি মিনমিন করে বললাম_ না আমি ওটা না..
— কোনটা না? আবার ধমকে উঠলেন উনি ।
— নায়িকা না!
মাথা নিচু করে বললাম ।
— নায়িকা না তো কি? হলিউডের মডেল? ঢং করো তুমি ঢং? কতগুলা বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেললে শুনি?
,
একথা শুনে আমি অবাক হয়ে তাকালাম ফোনের স্ক্রিনে ।
সে রাগীভাবে তাকিয়ে আছে , দাঁত চিবিয়ে বললো_
— চুলগুলো তো ঘোড়ার লেজ বানিয়ে ছেড়েছিস আবার রঙচঙ মেখে জোকার সেজেও বসে আছিস । এতো ঢং পাস কোথা থেকে রে?
— কি বলছেন রাইদ ভাই?
— ওহ হো কি বলছি বুঝতে পারছেন না আপনি? চুলে কালার করেছিস কেনো? চুল গুলো স্টেইট করেছিস কেনো?
— এটা ফ্যাশন রাইদ ভাই৷
— স্কুলে পড়তে যাস তুই ফ্যাশন করতে না , লাভ লেটার পেতে না । সাফ সাফ বলে দিচ্ছি তিনদিন পর আমি ব্যাক করছি দেশে । এবার যদি হাফ ইয়ার্লিতে ফার্স্ট না হতে পারিস তাহলে তোর লেখাপড়া বন্ধ করে দিবো আমি । আ্যান্ড আই মিন ইট!
বলেই খট করে ফোনটা কেটে দিলেন উনি ।
আমি তো তব্দা খেয়ে গেলাম ।
তবে প্রথমে উনি বেশ রাগ করে ফেলছিলেন , আবার কথার মাঝেই নিজের রাগটাকে কন্ট্রোল করে নিলেন ।
রাইদ ভাইয়ের এই দিকটা আমার প্রচন্ড ভালো লাগে ।

পরদিন সকালে আমি স্কুলে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বললাম ওদের ।
ওরা সবাই এবার আমাকে বোঝাতে থাকলো নিশ্চয়ই পজেটিভ সাইন এগুলো ।
সেও তোকে ভালোবাসে অমুক তমুক ।
আমি এবার নতুন স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করে দিলাম ।
দু’দিন কেটে গেলো স্বপ্নের মতো তাকে নিয়ে ভাবতেই ।
যেদিন রাইদ ভাই আসবেন ঠিক সেদিন স্কুলে একটা বিরাট ঝামেলা হলো ।
আমাদের ক্লাসের সব থেকে বাজে মেয়ে অনু আর আমার ফোনটা একদম সেম ।
তো ও ক্লাসে বসে বাজে ভিডিও দেখছিলো ঐ সময় আমাদের স্কুলের ক্লাবের চেয়ারম্যান ক্লাস ভিজিট করতে আসলেন ।
অনু বসেছিল আমাদের এক বেঞ্চ পেছনে ।
ও ইয়ারফোন লাগিয়েই ফোন দেখছিলো , যখন চেয়ারম্যান স্যার আসলেন তখন তো সবাইকে দাঁড়াতে হলো এবং এই ফাঁকে ওর হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেলো ।
ইয়ারফোনটাও খুলে গেলো ।
ফোনটা পড়েছিল আমারই পায়ের কাছে , স্যার ভেতরে আসামাত্র আপত্তিকর শব্দগুলো বাজতে শুরু করলো ।
সবাই তো অবাক ।
আশেপাশে খুঁজতে লাগলো সবাই আসলে কোথা থেকে শব্দ আসছে ।
অনুই চিল্লিয়ে বললো _স্যার ম্যাম এই দেখেন মিথির পায়ের কাছে ফোন!
ব্যাস হয়ে গেলো এবার!
ক্লাসে তো হাসাহাসি আছেই তারপর আমাকে অফিস রুমে নিয়ে যাওয়া হলো । এই ফাঁকে বলতেই পারলাম না আমার ফোন আমার ব্যাগে আছে ।
প্রিন্সিপাল ম্যাম বললেন গার্ডিয়ান কল করা হবে ।
আমি ভয়ে কাঁদছিলাম , কিছুই বলিনি কারণ আমি তো কিছু করিনি ।
আমার সামনেই গার্ডিয়ান কল হলো , ভাবলাম ফুপ্পি আসবে আমাকে তো বুঝবে ।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ফুপ্পি না রাইদ ভাই আসলেন ।
প্রিন্সিপাল ম্যাম যখন ওনাকে বলছিলেন ওসব তখন আমার জাস্ট লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো ।
সব শোনার পর উনি আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন_ মিথি এ ব্যাপারে তোর কিছু বলার আছে?
আমি কেঁদে কেঁদে হেঁচকি তুলে ফেলেছি । তারপরও ওভাবেই ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম_ আমি কখনো ওসব করিনি । আমার আর অনুর ফোন সেম , আমার ব্যাগেই আমার ফোনটা আছে ব্যাগটা আনলেই দেখতে পাবেন ।
আমার কথা শুনে ক্লাস থেকে ব্যাগ এবং অনুকে আনা হলো ।
ব্যাগ খুলে দেখা গেলো আমার ফোন আমার ব্যাগেই আছে ।
এবার রাইদ ভাই ম্যামকে কয়েকটা কড়া কথা শোনালেন । ওনারা আমাকে টিসি দিতে চাইছিলেন ,রাইদ ভাই রেগে বললেন আপনাদের টিসি দিতে হবেনা আমিই ওকে এই স্কুলে পড়াবো না ।

আমার ব্যাগ নিয়ে আমার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে আসলেন ।
উনি এতো জোরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন যে ব্যাথায় আমার অবস্থা শেষ ।
আমি না পেরে বললাম_ টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেনো! ব্যাথা পাই তো ।
কথাটা শেষও হয়েছে আর উনি ঘুরে ঠাস করে বসিয়ে দিয়েছেন একটা গালে ।
বেশ রেগে ধমকে বলেছেন_ স্কুলে ফোন আনতে বলছে কে তোরে হ্যাঁ?
ফাজিল মেয়েলোক । তোর লেখাপড়া আজকে থেকে বন্ধ ।
ধাক্কে গাড়িতে বসিয়ে হাইওয়ে দিয়ে আন্দাজি কোথায় যেতে শুরু করলেন ।
আমি তো কেঁদেকেটে অস্থির , গালে তিনটে আঙুলের ছাপ পড়েছে ।
প্রায় অনেক্ষণ কাঁদার পর আমার দূর্বল লাগছিল , ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিলো ।
সিটে হেলানি দিয়েই আমি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ।
তবে এক সময় আমার মনে হচ্ছিল আমি ঐ মুহুর্তে কারো বুকে আছি , ধুকপুক শব্দ শোনা যাচ্ছে ।
কেউ পরম যত্নে গালে নরম করে ছুঁইয়ে দিচ্ছে আর বলছে_ স্যরি বাচ্চাটা , খুব স্যরি । এতোটা ব্যাথা পাবা বুঝতেই পারিনি… এবং আরো অনেক কিছু ।
আমি জানিনা সেই স্পর্শ সত্যি নাকি স্বপ্ন তবে ঐ মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছিল আমি একটা রাজকুমারী এবং এই মানুষটা আমার একচ্ছত্র রাজকুমার ।
,
চলবে,