প্রেমে পড়া বারণ

প্রেমে পড়া বারণ ( সিজন-2 ) Part- 18

রেহান গম্ভীর একটা লুক নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো – এটা করলি কেন??
– কি করলাম?
– আমি ডাকার পরেও ইচ্ছে করে জবাব দিসনি।
– আমি শুনতে পাইনি।।
– মিথ্যে বলবি না। তুই মিথ্যে বললে তোর নাক লাল হয়ে যায় বুচি!
কেমন লাগে!! আমার নাক মোটেও বোঁচা নয়, কিন্তু রেহান প্রায়ই আমাকে প্রায়ই বুচি বলে!!
– ভালো করেছি জবাব দেইনি। উহহহ…. কি ভাব! গিয়েছিলি তো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে গল্প করতে, আমার কাছে নিয়ে আসতে কে বলছিলো তোরে?
– পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি!
রেহান নাক টেনে টেনে গন্ধ শুকছে।
– কিসের গন্ধ?
আমিও নাক টেনে গন্ধ বোঝার চেষ্টা করছি।
– নাক টেনে লাভ নেই। এই গন্ধ তুই পাবি না।
কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম
– কেন?
– হিংসের পুড়ে যাচ্ছিস! সেই পোড়া গন্ধ।
– হাহ!… হিংসেয় জ্বলে পুড়ে ছাইই হয়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি…..!!
কেনরে?
কেন? তুই যে মেয়েদের পিছনে ঘুরঘুর ঘুরঘুর করিস,এট কি নতুন? আর তুই ওই মেয়ের সঙ্গে কথা বললে আমি জেলাস হবো কোনো দুঃখে?
– আমি বলেছি ওর সঙ্গে কথা বলেছি বলে তুই জেলাস??
– তাহলে কি বলেছিস? কেন জেলাস??
– ওই রকম সুন্দরী একটা মেয়ে হেসে হেসে আমার সঙ্গে কত কথাই না বললো, কত ভাব হয়ে গেছে ওর সাথে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো হ্যান্ডসাম ছেলে তোর দিকে তাকিয়েও দেখেনি!
দেখবে কেন? হ্যান্ডসাম ছেলেদের চয়েস কি এতো বাজে হয়?? বুচি, নাক চ্যাপা একটা মেয়ের দিকে তাকাবে!!
এই জন্য তুই জেলাস।
– কোনো ছেলে তাকালে তোর কাছে এসে পারমিশন নিয়ে যায় বুঝি?! জানতাম না তো!
আর কে তাকায় না তাকায় তুই কিভাবে জানবি? আমার পিছনে স্পাই নিয়োগ করেছিস নাকি তুই আমার বডিগার্ড?!
রেহানের সঙ্গে আবার বড়সড় একটা ঝগড়া হয়ে যেতো। তার আগেই আনিষার বাবা এসে উপস্থিত হলেন। তাই কথা বন্ধ করে দুজনেই চুপ করে গেছি।
আনিষাদের বাসা থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেছে।
বাসায় এসে টুকটাক কাজ শেষ করে শুয়ে পড়লাম। দুদিন আরও অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে। ঘুমটা জরুরী।
কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না।
আমার ভেতরের দুর্বলতাকে কিছুতেই প্রশ্রয় দিতে চাইছিনা। তবুও ঘুরেফিরে সেই এক যায়গায় ফিরে আসি।
আমি বুঝতে পারছি না, তানিশা রেহানের সঙ্গে কথা বলায় আমার খারাপ লাগছে কেন? কেন আমি সহ্য করতে পারছিলাম না?
আমি কি রেহানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি??
আচ্ছা.. রেহানও কি এখন আমার কথা ভাবছে?
ওর মনে কি আমার জন্য ভাবনা আসে?
নাকি ওর ভাবনায় অন্য কেউ আসে!
কতশত ভাবনা ভীড় করছে মনে। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল উঠেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আজ মেহেন্দি।
তবে আজ আনিষাদের বাসায় যাচ্ছি না। সারাটা দিন অনেক ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেলো।
রেহান নিজের মতো সব কিছু করে যাচ্ছে। ওর মধ্যে কোনো ভাবলেশ নেই। সবকিছু স্বাভাবিক। আমিও আর ওকে ঘাটাইনি।
রাতে আর বাসায় ফিরলাম না কেউ।ফুপিদের বাসায় থেকে গেলাম সবাই।
…..
আজ তাহসিন- আনিষার বিয়ে।
যথাসময়ে তাহসিনকে নিয়ে হলে পৌঁছালাম।
আমরা তাহসিনের পাশে বসে আছি।
আনিষার কানিজ তারাও আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো।
তানিশাকে কোথাও দেখতে পেলাম না।রেহান ও এখানেই আছে।
তানিশাকে দেখতে না পেয়ে মনে মনে একটু খুশিই হলাম। কেন খুশি হলাম?
উত্তর টা কি আমার অজানা?
না, অজানা নয়। তবে নিজের কাছেও নিজে স্বীকার করতে চাইছিনা।
এই খুশি বেশি সময় স্থানী হলো না,একটু পরেই তানিশাকে দেখতে পেলাম। ও আমাদের দিকেই আসছে। এসে সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করলো।
কথায় কথায় জানতে পারলাম আনিষার ড্রেস ওর ডিজাইন করা। আর মেকাপের সবকিছু ও নিজেই করেছে। তাই আনিষাকে সাজানোর পরে নিজে রেডি হয়ে আসতে দেরি হয়ে গেছে।
বিয়ের আসর জমে উঠেছে। তানিশা এগিয়ে গিয়ে রেহানের পাশেই বসলো।
এখানে হাসি-ঠাট্টা আমার ভালো লাগছে না। বিরক্ত লাগছে।
উঠে চলে এলাম। এসে একটা ফাঁকা কোনে বসে রইলাম। বিয়ে পড়ানো হলো।
কিন্তু সেদিকে আর যাইনি।
বিয়ে পড়ানোর পরে রেহান আর খুশবু আমার কাছে এলো।
– এখানে বসে আছিস কেন? সব যায়গায় খুঁজতে খুঁজতে শেষ। ( রেহান)
– হারিয়ে যাইনি তো, এখানেই ছিলাম।
– তোর শরীর খারাপ লাগছে, হিয়া?( খুশবু)
– না, মাথা ধরে আছে। ভালো লাগছে না।
তাই এখানে বসে আছি।
– তাহসিন তোকে খুঁজেছিলো। পায়নি।( খুশবু)
– আর বসে থাকতে হবে না এখানে, চল। উঠ।
ফেরার সময় হয়ে যাবে। ( রেহান)
অগত্যা উঠে গেলাম ওদের সাথে।
বিয়ের আসরে গেলাম। আমাকে দেখে তানিশা একটু কেমন করে যেন তাকালো!
আম্মু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন – হিয়া, কোথায় ছিলি এতোক্ষন?
– মাথা ধরে আছে আম্মু,তাই এই সাইডে বসে ছিলাম।
কনে বিদায় হলো। আমরা নতুন বউ নিয়ে ফিরে এলাম।
রাতে আমি ফুপির বাসায় থাকতে চাইলাম না।মাথা অনেক ধরে আছে।
অনেক রাতেই বাসায় ফিরলাম। আমার সঙ্গে আব্বু,রিফাত আর রেহানও চলে আসলো।
……
বিয়ের ঝামেলা শেষ হয়েছে কয়েকদিন হলো।
ইদানীং আমিও ব্যস্ত হয়ে গেছি। একাডেমিক পড়াশোনা শেষ হলেও, জবের জন্য পড়াশোনা করতে হচ্ছে।
বন্ধুদের সাথেও আগের মতো দেখা হয় না, আড্ডা হয়না।
তবে রেহানের সাথে রোজই দেখা হতো।
কিন্তু আজকাল রেহানও অমাবশ্যার চাঁদ হয়ে যাচ্ছে!!
বিকালে ছাদে দাঁড়িয়ে আছি।
আকাশ মেঘলা। যেকোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে।
এদিক সেদিক দেখে অভ্যেস মতো চোখ গেলো রেহানদের বাসার দিকে।
কাউকে দেখা যাচ্ছে না। রেহানের বেলকনিও খালি।
ইদানীং আমার কিছু ভালো লাগে না।
কেমন অদ্ভুত একটা শূন্যতা অনুভব করি।সময় আর আগের মতো নেই।ক্যাম্পাস! বন্ধু! আড্ডা! এসব এখন কেবলই স্মৃতি।
সেই জীবনটাকে বড্ড মিস করছি। শত চাইলেও এখন সেই জীবনটা ফিরে পাবোনা।
হঠাৎ করেই অনুভব করছি অনেক বড় হয়ে গেছি। জীবনের সোনালী একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে!
এসব ভাবলেই চোখ ভিজে যায়।
আনমনা হয়ে যাই।
– যাক,অবশেষে তোকে পাওয়া গেলো!
রেহান কখন ছাদে এসেছে টের পাইনি
– তুই?
– হুমম।
– কখন আসলি?
– অনেকক্ষন। তুই খুব গভীর ভাবনায় ডুবে ছিলি,এজন্য ডাকিনি।
– হুম।
– হুম কি? সারা বাসায় খুঁজে তারপর ছাদে পেলাম।
– একটু আগেই আসছি ছাদে।
– একটা গুড নিউজ আছে!
– কি গুড নিউজ?
অনেক আগ্রহী হয়ে উঠলো আমার মন।
– গেইস কর।
– তোর স্কলারশিপ হয়ে গেছে!
– ধুর! আমি এপ্লাই ই তো করিনি স্কলারশিপের।
– ওহহ… তাইতো।
তাইলে তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!
– আর কিছু আসে না তোর মাথায়! গাধী!
– আসেনা বলেই তো বললাম তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
আচ্ছা, আরেকবার গেইস করি…..
উমম…. Rosy বাচ্চা দিয়েছে! ( Rosy রেহানের খরগোশ)
– মাফ কর আমারে, আর গেইস করতে হবে না!
– হয়নি??
– জিনা, হয়নি।
– তাহলে তুই-ই বল…
– যে ইন্টারভিউটা দিয়েছিলাম মনে আছে?
– হুম… এই তোর জব হয়ে গেছে???!!!
উত্তেজনায় যেন আমার চোখ জ্বলজ্বল করছে।।
– হা… জবটা হয়ে গেছে। আগামী মাসের ১- ৭ তারিখের মধ্য জয়েন করতে হবে।
আর এই নিউজটা আব্বু-আম্মুকে বলে সোজা তোকে বলতে এসেছি।
– ইন্টারভিউ বোর্ডটা খুব বাজে ছিলো বোঝাই যাচ্ছে!.
– কেন??
– খারাপ না হলে তোকে সিলেক্ট করে?
বাই দ্যা ওয়ে – Congratulations!
– দেখ, ঝগড়া করার মুড নেই আজ।
তোর তো সবসময় আমার দোষ খোঁজার অভ্যাস।কিন্তু উনারা আমার গুণ দেখেছেন। সেজন্যই আমাকে সিলেক্ট করেছে।
বুঝলি বুচি??
বলেই আমার নাকে একটা টান দিয়ে হনহন করে চলে গেলো রেহান।
আচ্ছা আমার নাকটা কি সত্যিই চ্যাপা?
নিজেই নিজের নাক টেনে পরখ করছি।
আমি ওর যাবার পথে চেয়ে রইলাম।
গুড়গুড় করে আকাশে মেঘ ডাকছে।এই বুঝি বৃষ্টি নামলো।
রেহানের চাকরিটা হয়ে গেছে। সত্যিই ভীষণ খুশি হয়েছি।
আজ আমার অনেক বেশি আনন্দ হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। ভিজতে ইচ্ছে করছিলো খুব। আজ ভিজবো।।
হা… ভিজবো।
চলবে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *