দৃষ্টির বাহিরে !! Part-03
ইরফানির আশা আমি ছেড়ে দিলাম।
সেদিন ভাবলাম নীল অফিসে গেলে আমাকে বাসায় একাই কাটাতে হয়! হাতে তেমন কাজ থাকে না। বাসায় একা একা থাকতেও ভালো লাগে না।
তাই সিদ্ধান্ত নিলাম একটা চাকুরী করবো। আর নীলকে যদি ছেড়ে চলে যাই তাহলে চাকুরীটা কাজে দিবে।
সেইভেবে অনলাইনে চাকুরীর জন্যে আবেদন করলাম। নীলকে বিষয় টা বলি নি! কারন ও হয়তো এটা শুনলে রাগ করবে! আবার আমার ওপর অত্যাচার করবে।
জয়া?
জ্বী বলো।
তোমার আমার প্রতি রাগ হয় না? ঘৃণা করে না আমাকে একটুও? আমি তোমাকে এত অত্যাচার করি?
ওমা রাগ হবে কেন? তুমি আমার স্বামী, আমার ওপর শুধু তোমার অধিকার।
আচমকা আমার এই কথায় নীল ভীষণ রেগে গেলো, আর আমার চুল টা ধরে বললো, তোর আমার প্রতি রাগ হয়না কেন? কেন ঘৃণা করিস না?
আমার লাগছে, ছাড়ো!
লাগুক! তুই বল আমাকে ঘৃণা করিস!
তুমি পাগল হয়ে গেছো নীল?
হ্যাঁ আমি পাগল! তোর চোখে ঘৃণা দেখার জন্যে আমি পাগল। তুই বল আমাকে ঘৃণা করিস?
নীল আমি কেন তোমাকে ঘৃণা করবো? কি আবোলতাবোল বলছো?
কথাটা বলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল নিজের রুমে।
আমি বুঝতে পারলাম না কিছু! কেন ঘৃণা দেখতে চায় নীল আমার চোখে?
অনলাইনে চাকুরীর জন্যে যে দরখাস্ত করেছিলাম সেটার পরীক্ষা আজ। আমার কোনো প্রস্তুতি নেই, তবুও গেলাম পরীক্ষা দিতে। নীল অফিসে চলে যাওয়ার পর আমিও বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম।
পরীক্ষা মোটামোটি হলো। পরীক্ষার হল থেকে অটোতে করে আসার সময় দেখলাম, রাস্তায় অনেক ভীর। মনে হচ্ছে কারো এক্সিডেন্ট হইছে!
আমি অটো থেকে নেমে দেখলাম। এক বৃদ্ধ লোক মাটিতে বসে আছে আর তার মাথা ফেটে প্রচুর রক্ত বের হচ্ছে।
আমি লোকটাকে ধরে একটা অটোতে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, লোকটার থেকে উনার স্ত্রীর নম্বর নিয়ে বাসায় ফোন দিলাম।
উনার স্ত্রী আসার আগেই আমি ওখান থেকে চলে এলাম কারন নীল হয়ত এতক্ষনে বাসায় চলে গেছে! আমাকে না দেখে ও হয়ত অনেক রেগে থাকবে! আর আবার আমার ওপর পাশবিক অত্যাচার করবে।
আমি বাসায় আসার পর দেখলাম নীল এখনও আসে নি! নীল তো এতক্ষনে চলে আসে। কিন্তু আসেনি কেন??
আমি নীলের ফোনে বারবার ফোন দিলাম কিন্তু কল রিসিভ করলো না কেউ! আমার নীলের জন্যে খুব টেনশন হচ্ছিলো!
নীলের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে রাত ১২টা বেজে গেল, এখনো নীল আসেনি! আমি অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম সোফাতে।
১টার দিকে নীল এলো। আমি তখনও ঘুমিয়ে। হঠাৎ নীল এসে আমাকে ডাকলো।
আমি উঠতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। আমি ওর এই ব্যবহারে অনেক বেশি অবাক হলাম। একি সত্যি নীল নাকি স্বপ্ন দেখছি আমি!!
দুজনের মধ্যে এক নিরবতা, নীলের কান্না দেখে আমিও কেঁদে ফেললাম।
আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার কি করা উচিত!
একটু পর নীল নিজেকে সামলে বলল, ধন্যবাদ! আজ তুমি না থাকলে…
আমি না থাকলে কি? বলো?
না কিছু না, খেয়েছো?
তুমি না খেলে আমি কখনো খেয়েছি যে আজ খাবো?
এত রাত হয়ে গেছে তবুও খাওনি কেনো?
চলো খেয়ে নেই।
এ যেন আমি এক নতুন নীলকে দেখছি! ও আসলেই কি নীল নাকি অন্যকেউ? আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা! আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন। তার রহমতে নীল বদলে গেছে! আমি খুশিতে কেঁদে ফেললাম।
নীল আর আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে না। অনেক বেশি কেয়ার করে।
নীল অফিস থেকে আসার সময় আমার জন্যে একটা গিপ্ট এনেছে! আমি খুলে দেখলাম সেখানে শাড়ি!
শাড়ি!?
হুম জয়া, তোমার তো শাড়ি খুব পছন্দ তাই না? আর শাড়ি তোমাকে অনেক মিষ্টি লাগে।কিন্তু আমি তো কখনো পড়তে দিতাম না!
আমি কিছু বলতে পারছিলাম না, শুধু আবেগে চোখ থেকে পানি পড়ছিলো! নীল আলতো করে আমার চোখের পানি মুছে বলল, আমি চাই আমাদের সম্পর্ক ঠিক করে নিতে।
কি বলছো কি?
আমাকে একটা স্বাভাবিক জীবন দিবে জয়া? আমি সত্যি আজ ক্লান্ত।
আমি কিছু বলতে পারছিলাম না, শুধু কান্না পাচ্ছিলো।
আমি কান্না থামিয়ে বললাম, নীল আমাকে কিছুদিন সময় দিবে?
ঠিক আছে।
আমি নীলের থেকে এই জন্যে সময় চাইলাম যাতে আমি ওকে ওর বাবা-মার সাথে মিলিয়ে দিতে পারি।
আমি নীলের বাবা-মার সাথে দেখা করার জন্যে বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি!
নীল বাবা-মা আমাকে দেখে প্রচুর রেগে গেলেন!
তুমি? কেন এসেছো? আমার ছেলেকে আমার থেকে দূরে করে এখন আবার কি করতে এসেছো?
আন্টি! সব দোষ আমার! আপনার ছেলের কোনো দোষ নেই। আমার দোষের শাস্তি কেন নিজের ছেলেকে দিবেন?
আপনাদের ছেলে এখনো আপনাদের জন্যে কাঁদে! দয়া করে নীলকে আপনারা মেনে নিন। বিনিময়ে আমি নীলের জীবন থেকে চলে যাবো। কিন্তু নীলকে এরকম শাস্তি দিবেন না। আপনাদের ছাড়া আমরা ভালো নেই। প্লীজ আনকেল আন্টি নীলকে ক্ষমা করে দিন।
নীলের বাবা-মা কাঁদতে লাগলো।
মারে, তোমাকে আমরা ভুল ভেবেছিলাম, ভেবেছিলাম তুমি আমাদের ছেলেকে টাকার জন্যে বিয়ে করেছো, কিন্তু আজ বুঝলাম, নীলের কিছু না থাকা সত্ত্বেও তুমি ওকে ছেড়ে যাও নি। আমাদের নীল অনেক ভাগ্যবান! যে তোমার মতো স্ত্রী পেয়েছে। নীলের জন্যে তোমার মতো ভালো মেয়ে আমরাও পেতাম না। নীল জীবনে অনেক অন্যায় করেছে! আর সেই অন্যায়গুলোকে আমরাও সমর্থন করেছি। কখনো কিছু বলিনি, কিন্তু আমার ছেলে কোন ভালো কাজের ফল সরূপ তোমাকে পেয়েছে আল্লাহ ভালো জানেন।
আনকেল আন্টি এভাবে বলবেন না, নীল আমার স্বামী, আর স্বামীর যেকোনো অবস্থায় সাথে থাকা স্ত্রীর কর্তব্য।
আমাদের আনকেল, আন্টি কেন বলছো? বাবা মা বলো।
মা, বাবা! আপনারা চলুন আমার সাথে নীলের কাছে।
না মা।
কেনো বাবা?
আজ আমরা যেতে পারব না। সামনের মাসের ১০ তারিখে ওর জন্মদিন, সেদিন যাবো!
ঠিক আছে।
আমি ওখান থেকে চলে এলাম। নীলের বাবা-মা আচরণ কিছুটা অবাক লাগলো আমার! ছেলের সাথে দেখা করতে এত সময় কেন চাইলো?
বাসায় আসতেই একটা অপরিচিত নম্বর থেকে আমার ফোনে কল এলো।
আমি কল রিসিভ করতেই একটা মেয়ে বলল,
তুমি কি জয়া?
জ্বী! আপনি কে বলছেন?
নীলের স্ত্রী?
জ্বী! আপনি কে?
ইরফানি।
ইরফানি!
হ্যাঁ ইরফানি, নীলের ইরফানি। তুমি তো আমাকে ফেসবুকে নক করেছিলে, আমি সেটা ১সপ্তাহ আগে দেখলাম, তারপর তোমাকে অনেক মেসেজ করেছি কিন্তু কোনো রিপ্লাই পাইনি। অনেক কষ্টে তোমার নম্বর যোগার করেছি। আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। আমার তোমাকে কিছু বলার আছে।
কি বলবেন আমাকে?
সেটা না হয় দেখা হলেই বলব।
কিন্তু আমি কেন আপনার সাথে দেখা করবো?
এছাড়া তোমার কাছে কোনো উপায় নেই, কারন নীল শুধু আমাকে ভালোবাসে।
তাই লক্ষী মেয়ের মতো যে ঠিকানা টেক্সট করছি কাল নীল অফিসে গেলে চলে এসো।
আপনি কি করে জানলেন নীল আমাকে ভালোবাসে না?
যদি নীল তোমাকে ভালোবাসত তাহলে তুমি আমাকে নক দিতে না। আমি তোমাকে ঠিকানাটা টেক্সট করছি। চলে এসো।
ইরফানি কেনো আমার সাথে দেখা করতে চায়? কি চায় ও? নীল আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে আর এসময় ইরফানি! হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আবার কোন নতুন পরীক্ষায় ফেলছেন? যদি ইরফানি নীলের জীবনে ফেরত আসতে চায় তাহলে আমি কি করবো?
চলবে?