আড়ালে ভালোবাসার সংসার !! Part- 30
চেইনের লক লাগিয়ে বিথীর ঘাড়ে হালকা কামড় দিলো। বিথী কেপে উঠে হালকা আর্তনাদ দিয়ে উঠলো যা দেখে বিধান সেই জায়গায় আলতো চুমু দিলো। বিথী আর না পেরে বিধানকে পিছন ঘুরে জড়িয়ে ধরলো। বিধান মুচকি হেসে কারের দরজা খুলে বিথীকে বসালো এবং নিজেও পাশে অর্থাৎ ড্রাইভিং সিটে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে কিন্তু বিথী বিধানের হাতের উপর হাত রাখলো এবং বিধান বিথীর দিতে তাকাতেই বিথী বিধানকে মানা করলো গাড়ি স্টার্ট দিতে।
বিধানঃ কিছু বলবে? (বিথীর চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে)
বিথীঃ হুম কিন্তু রাগ করবেন না তো? (মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে)
বিধানঃ আচ্ছা বলো।
বিথীঃ আমি ঐ চেইনটা পড়তে চাই! দেখুন রাগ করবেন না আমার উপর প্লিজ……….আপনি তো শুনলেনই নীল ভাইয়া কত সখ করে দিলো……..উনার ইমোশনস জুড়ে আছে তাই আমি চাচ্ছি…….
বিথী পুরো কথাটা মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে বলল তাই বিধানের প্রতিক্রিয়াটা দেখতে পারলো না। যদি একবারও মুখ তুলে তাকালো তাহলে বিধানের রক্তিম চোখ জোড়া ও হিংস্র সিংহের মতে মুখটা দেখতে পারতো।
বিধানঃ কন্ট্রোল বিধান! কন্ট্রোল প্লিজ! ইউ হ্যাভ টু ম্যানেজ হার ইন আ আদার ওয়ে! (চোখ বন্ধ করে মনে মনে)
বিধান বিথীর দিকে তাকিয়ে দেখলো বিথী তখনও মাথা নিচু করে আছে তাই একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বিথীর মুখটা দুই হাত দিয়ে বিথীর মুখটা তুলে ধরলো। বিথীর নজর তখনও নিচের দিকেই।
বিধানঃ জান! ( মাতাল কণ্ঠে)
বিথীঃ হুম! ( নিচু গলায়)
বিধানঃ জান শুনো তুমি তো জানো স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক তাই তো আমার বুকের হারটা তোমার বুকে। নীলাভ্র বলেছিলো তোমাকে এটা নিজের সাথে জুড়ে রাখতে তাই না? ( বিথীর কপালে চুমু দিয়ে বুকে নিয়ে)
বিথীঃ হুম। (মাতাল কণ্ঠে)
বিধানঃ তাহলে তোমার তুমিটাই তো আমি তাই চেইনটা আমার সাথে জুড়ে থাকলেও তো একই ব্যপার। এই যে আমি এটা হাতে ব্রেসলেটের মতো পড়ে নিচ্ছি তাহলেই তো হবে তাই না?
বিথীঃ হুম ( আবেশে চোখ বন্ধ করে মাতাল কণ্ঠে)
বিধান মুচকি হেসে বিথীকে সিটে ঠিকভাবে বসিয়ে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিয়ে মনে মনে বলল, বিধান ওয়েল ডান। ইউর প্ল্যান ওয়ার্কড রেয়ালি ওয়েল।
বিথী বিধান বাসায় চলে গেলো। বিধান মনে মনে বলল, থাকবে তো আমারই নিজের ইচ্ছেতেই অথবা আমার ইচ্ছে, কিছু মিথ্যেতে, কিছু চালে। (মমে মনে)
।
❤
।
সাতদিন পর বিথীকে নিয়ে বিথীর বাসায় যাচ্ছে কারণ সেখান থেকে কক্সবাজার যাবে। এই কয়েকদিন বিথী ও বিধানের বৈবাহিক জীবনের অনেকটাই উন্নতি হলেও সম্পর্কের পরিপূর্ণতা হয়নি তাছাড়া কয়েকদিন ধরে বিথী-বিধান একে অপরের সাথে কথা বলে না। বিথীও বুঝতে পেরেছে সে বিধানকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। তবে দিশার উপর বেশ বিরক্ত বিথী কথায় কথায় বিধানের গায়ে ধসে পড়া, ওদের বেডরুমে নক ছাড়া আসা সহ সবকিছুই যেনো বিথীর কাটার মতো বিধে তার মধ্যে কক্সবাজার যাবে সেখানেও এই মেয়েকে নিয়ে যেতে হচ্ছে। বিথীর এখন সন্দেহ হয় বিথীকে ভালোবাসে তো বিধান নাকি দিশাকে ভালোবাসে শুধু সম্পর্ক বাঁচাতে বিথীকে যত্ন করে।
এই তো কিছুদিন আগের কথা বিধান বিথীকে দিশার জন্য বকলো। বিথী ও বিধান কক্সবাজার যাওয়ার কথা চলছিলো। সেখানে দিশাসহ বিধানের কাজিন নিহালও ছিলো।
মিসেস চৌধুরীঃ বিধান তুই আর বিথী মা না কয়েকদিন পর কক্সবাজার যাবি ঘুরতে?
বিধানঃ হ্যাঁ আম্মু।
দিশাঃ আমিও যাবো তোদের সাথে বিধু!
বিধানঃ অবশ্যই যাস আমাদের সাথে!
দিশাঃ থ্যাংক ইউ বিধু!
মিসেস চৌধুরীঃ নাহ দিশু তোমার যাওয়ার দরকার নেই! বিথী-বিধানের এখনও বিয়ের পর কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি তাই ওরা একাই যাক।
দিশাঃ কিন্ত……..
মিসেস চৌধুরীঃ কোনো কিন্তু নয়।
বিধানঃ মা থাক না ও যাক আমাদের সাথে। ওই খানে তো আমরা একা যাচ্ছি না।
মিসেস চৌধুরীঃ দেখ তুই বুঝছিস না তো। সেখানে যারা যাচ্ছে তারা সবাই কপত-কপতি…….দিশার মতো কেউ নেই ওর খেয়াল কে রাখবে? ও এখানে নতুন বাংলাদেশের মারপ্যাঁচ ও বুঝবে না।
এতক্ষণের কথোপকথনের নিরব শ্রোতা ছিলো বিথী কিন্তু এবার সে আর চুপ থাকতে পারলো না মুখ খুললো।
বিথীঃ হুমম মামনি ঠিকই বলেছেন। আপু তো এখানে নতুন যদি কিছু হয়ে যায়!
বিধানঃ তুমি চুপ করো তো! তোমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেছে সব বিষয়ে নাক গলাবে আমাদের ব্যপারে তুমি কথা বলো কেনো!
বিধান অনেক জোড়ে ধমক দিয়ে কথাগুলো বলল। বিথীর লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে বিধানের এভাবে তার উপর রেগে যাওয়ায়। বিথী অনেক কষ্ট কান্না নিয়ন্ত্রণ করলো কারম কারো সামনে সে কাঁদতে চায় না।
মিসেস চৌধুরীঃ বিধান তোর কি মাথা খারাপ এভাবে মেয়েটার উপর চেঁচামেচি করছিস! (রেগে)
বিথীঃ নাহ মা আমারই ভুল হয়েছে আপনাদের পারিবারিক বিষয়ে বাইরের মানুষ হয়ে কথা বলা উচিত হয়নি।
তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে কথাগুলো বলে চলে গেলো ড্রইংরুম থেকে উঠে। বিধান বিথীর কথায় বুঝতে পারলো সে কি ভুল করেছে।
বিধানঃ শিট রাগটা কেন যে কন্ট্রোল করতে পারি না……..নিহালকে বাজে দৃষ্টিতে বিথীর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাগটা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছিলাম। এখন আবার জানপাখিটার রাগ ভাঙানো লাগবে। (মনে মনে)
এদিকে বিথী ওয়াসরুমের গেট লাগিয়ে অনেক্ষণ কাঁদলো। আর বলল, তাহলে বিধানের আগের রূপটাই সত্য ছিলো। ও আমাকে একটা মিডেল ক্লাস চিপ মেয়ে মনে করে তাইতো আমাকে এভাবে সকলের সামনে……(বলে এভাবে কাঁদিলো)
সেদিন বিথীর আসার আগেই বিথী স্লিপিং পিলস খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। পরের দিন থেকে বিধান একটা জরুরি কাজে বিজি হয়ে যায় তাই বিথীর রাগ ভাঙানোর সময় পায়নি কারণ বিধান বিথীর উঠার আগে অফিসে চলে যেতো আর বিথী বিধানের আসার আগেই ঘুমিয়ে যেতো। তাই এই কয়েকদিন কথা হয় না বললেই চলে।
।
❤
।
বর্তমানে বিথী রেডি হয়ে বসে আছে কারণ বিধান নাকি অফিসে যাওয়ার সময় মিসেস চৌধুরীকে বলেছেন বিথী তৈরি থাকতে সে এসেই নাকি নিয়ে যাবে। ইদানীং বিথীও বেশ ভাবলেশহীন হয়ে গিয়েছে বিধানকে নিয়ে ঐ যে কথায় আছে না চোখের আড়াল তো মনের আড়াল। বিথী সেটারই চেষ্টায়। সারাদিন কোনো না কোনো কাজে নিজেকে বিজি রাখে যাতে বিধানের কথা একবারও মনে না পড়ে আবার রাতে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে যায় বিধান ফিরার আগে কিন্তু মনটা বড্ড বেইমান তাই মনে পড়েই যায়।
তারপরও বিথী নিজেকে বিধান থেকে নিজেকে আড়াল রাখার প্রচেষ্টাই করে যায়। ধীরেধীরে বিধানের সব চিহ্ন শরীর থেকে তুলে ফেলেছে তা বিধানের দেয়া চেইন হোক, বিয়ের চুড়ি হোক আর বিধানের ভালোবাসার স্পর্শ থাকা আংটিই। আজকাল বিধানের কিনা আনা বা এই বাসার থেকে পাওয়া কোনো কাপড়ই পড়ে না। নিজের পুরাতন জামা-কাপড়ই পড়ে। আজ বিধান একটা নীল শাড়ি রেখে গিয়েছিলো হয়তো বিথীর জন্যই তবে অভিমানে পড়লো না বরং সেটা নিয়ে দিলো দিশাকে পড়ার জন্য এবং নিজে একটা পুরাতন পেস্ট কালারের জামদানি পড়ে নিলো। সে কি জানতো এই শাড়ি পড়া তার কাল হবে।
খানিকটা সময় পর আশার কল এলো বিথীর কাছে।
আশাঃ হ্যালো বিথী!
বিথীঃ আসসালামুয়ালাইকুম আশাপু।
আশাঃ ওয়ায়ালাইকুম আসসালাম। শোন আমরা মিনিবাস নিয়ে তোদের বাসায় আচ্ছি সেখান থেকে তোকে আর বিধানকে কল্প দিবোনে।
বিথীঃ আচ্ছা আপু।
বলে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দিশাকে যেয়ে খবরটা দিলো। দিশা বিধানের দেয়া শাড়িটা পড়েই রেডি হয়ে গার্ডেনে বিথীর সাথে বসে বাসের অপেক্ষা করতে লাগলো। প্রায় আধা ঘন্টা পর মিনি বাস আসলো তাই বিথী ও দিশা বাসে উঠে বসলো। বিথী যেয়ে আয়াশার পাশে বসলে তার পার বিপরীত পাশেই বসেছিলো নীলাভ্র। নীলাভ্রের পাশে জানালের পাশের সিটটায় বসলো দিশা।
আশাঃ কিরে বিথী বিধান কোথায়?
বিথী কিছু বলার আগেই দিশা বলে উঠলো, বিধু কল টেক্সট করেছে আমাকে একটু আগে ওর আর পাঁচ মিনিট লাগবে আসতে।
আশাঃ ওহ।
দিশার কথা শুনে বিথী তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মনে মনে বলল, আমার মূল্য কতটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি……তুমি কখন আসো যাও তা আমাকে জানানোর প্রয়োজনবোধ না করলেও দিশাকে…….
আর বলতে পারলো চোখ বুঝে নিলো কারণ চোখের পানিটাকে আড়াল করতে হবে। কিছুক্ষণ পরই বিধান আসলো। এসেই রাগো চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেলো তার।
আশা ও আয়ান সামনে তাকিয়ে দেখলো বিধান বাসের সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে আছে।
আশাঃ আরে বিধান এসে পড়েছো তো! যাও যেয়ে সিটে বসো…..আর ড্রাইভার চাচা আপনি গাড়ি স্টার্ট দিন এখন!
আয়ানঃ হ্যাঁ চাচা স্টার্ট দিন।
বিধান আশা ও আয়ানের কথা শুনলে কিনা তা বুঝা গেলো কারণ বিধান একদৃষ্টিতে বিথীর দিকে তাকিয়ে আছে আর বিথী আশার কথায় একপলক দেখে আবার বাইরের দৃশ্য দেখায় মনোনিবেশ করলো। বিধানের রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে তবুও কিছু বলছে না কারণ সময় ও পরিস্থিতি সবকিছুকেই হার মানাতে বাধ্য। বিধান কোনোমতেই চায় না বিথীর কার্যকলাপের প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ককে নষ্ট করতে তাই সে দাঁতে দাঁত চেপে বিথীর দিকে তাকিয়ে রাগ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আজ তার অত্যাধিক রাগের কারণ হলো বিথীর বর্তমানের সাজসজ্জা। বিধান বাসে উঠতেই বিথীর দিকে প্রথম নজর যেতেই দেখা বিথী তার দেয়া শাড়ি তো দূরে থাক সে বিয়ের চুড়ি, নাকফুল, বড় ডায়মন্ড পাথরের আঙটি কিছুই পড়েই নাই বরং বিধান যেই পেন্ডেন্টটা যা তার ভালোবাসার চিহ্ন রূপে দিয়েছিলো এবং কোনোদিন খুলতে না করেছিলো সেটাও সে পড়েনি। তার উপর বিথীর অপর পাশের সিট জোড়ার একটিতে নীলাভ্র বসে আছে। আরও রেগে গেলো তখন যখন সে এসেছে দেখেও বিথী কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না বরং এক পলক দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো।
নিজের ভালোবাসার মানুষ ও বউ থেকে কোনো মানুষই এতোটা অবহেলা সহ্য করতে পারে না। বিধানও তার বিপরীত নয় তাই রেগে গেলো তবে কোনো দৃষ্টিকটু দৃশ্য তৈরি করতে না চাওয়ায় চোয়াল শক্ত করে চোখ জোড়া বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল, কন্ট্রোল বিধান! কন্ট্রোল ইউর সেলফ! ইফ ইউ রিয়েক্ট ইউ উইল স্পয়েল এভ্রিথিং…….জাস্ট ওয়েট ফর দ্য রাইট মুমেন্ট ব্রো!
আয়ান বিধানকে বাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড় করতে দেখে কিছুটা ভ্রু কুচকালো।
আয়ানঃ কি হলো বিধান দাঁড়িয়ে আছে কেনো! আর কি বলছো একা একা? (অবাক হয়ে)
বিধানঃ আপনার শালির জন্য এ অবস্থায় আছি কেনো ভালো লাগছে না! (বিধানের কথাটা বলার তীব্র ইচ্ছে কাজ করলেও তা উপেক্ষা করে কোনো কিছু বলল না)
আশাঃ হ্যাঁ বিধান দাঁড়িয়ে না থেকে যেয়ে বসো গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে চাচা……পড়ে যাবে তো!
বিধানঃ যাচ্ছি আপু……আর কিছু না ভাইয়া একটু মাথা ব্যথা কয়েকদিন ধরে কাজের প্রেশার পড়ে গিয়েছিলো আর আজকেও তো সারাদিন অফিস করে এই সন্ধ্যা বেলা ফিরলাম তাই একটু……
আয়ানঃ ওহ আচ্ছা যাও যেয়ে বসো! আর কিছু খেয়ে নিয়ো পিছনে খাবারের বাক্সগুলো রাখা।
বিধানঃ হুম।
বিথী এতোক্ষণের কথোপকথনের নিরব শ্রোতা ছিলো তবে দর্শক নয় কারণ সে তার সর্বচ্চো চেষ্টা করে যাচ্ছে বিধানকে উপেক্ষা করে বাইরের দিকে তাকিয়ে সেই দৃশ্যটাতে মনোযোগিতা দেয়ার। কিন্তু অবাদ্ধ মনটা আর কানটা, চোখটা কিছুই সায় দিচ্ছে না একমাত্র মস্তিষ্ক ছাড়া। সেই মস্তিষ্কের জোড়েই চোখ জোড়ার নজর বাইরের দিকেই রেখেছে। কিন্তু কান ও মন অবাদ্ধ হয়ে সব শুনে নিয়েছে। এখন তো কথাগুলো শুনে মস্তিষ্কটাও অবাধ্য হয়ে গিয়েছে।
বারবার শুধু বিধানের কথাগুলোই ভাবছে। বিথী এবার চোখ জোড়া বন্ধ করে মনে মনে বলল,
কেনো এতো ভাবছি তাকে নিয়ে,
কেনো মন চাচ্ছে শুধুই তাকে!
তার আগমন তো মাত্র কয়েকদিনের,
তারপরও কেনো সে সবটা জুড়ে!
মন তো ছিল সর্বদাই আমার রাজত্ব-শাসনে,
তারপরও কি করে হয়ে গেলো বন্দী তার বেড়াজালে!
এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো শুধু একটাই,
ভালোবাসি, বড্ড ভালোবাসি আমার এই অপ্রিয় আমিটাকে!
ভাবলেশহীন ভাবে কবিতাটি বলেই একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বাইরের দিকে তাকিয়েই চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। আর আবার বিধানের কথাগুলোর মনে পড়তেই নানা দুর্ভাবনা দানা বাধতে লাগলো মনে।
বিথীঃ লোকটা শরীরটাকে আসলেই অনেক ক্লান্ত লাগছে……চোখ জোড়াতেও ক্লান্তি নেমে এসেছে। আগে কেনো চোখে পড়েনি এসব…..আহহা পড়বে কি করে কয়েকদিন ধরে লোকটার ধরা-ছোঁয়া, দেখা-সাক্ষাতের বাইরেই আছি। শুনেছিলাম প্রেয়সীর এক নজরের দেখা পেয়ে নাকি প্রেমিক পুরুষের শত বছরের ক্লান্তি দূর হয়……তাহলে কি আমিও উনার ক্লান্তি দূর করতে সক্ষম ছিলাম। না! না! কি ভাবছি! যদি সেই যোগ্যতাই থাকতো তাহলে অপমান ও হেয়ো হতাম না কখনো তার কাছে………তাকে তোকে উপেক্ষা করতেই হবে বিথী।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই বিধান তার পাশে এসে বসেছে। সে টের পেলেও একটু টু শব্দেও করলো না। এমন অভিনয় করার প্রয়াশ করলো যে সে ছাড়া আর কেউ নেই তার পাশে এবং কিছুই হচ্ছে না তার আশেপাশে। এদিকে বিধান আয়াশাকে কোলে তুলে বিথীর পাশে বসে বিথীর দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো বিথী ভাবলেশহীন ভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ না চাইতেও বড্ড ক্লান্তি আসছে তার। হাপিয়ে উঠেছে কিছুটা বিথীর প্রতি সম্পর্কের প্রতি কারণ অবহেলার যে শেষ পাচ্ছে না সে। বিথী তো পারে বিধানকে একটু বুঝতে, অন্যান্য স্ত্রীর মতো বিধানের ভুলে তাকে শাসন করতে বুঝাতে, তার রাগগুলোকে অভিমানগুলোকে একটু গুরুত্ব দিয়ে ভাঙাতে। সে তো প্রতিবারই বিথীর কাছেই যায় বিথী কি পারে না নিজে থেকে এক কদম তার দিকে অগ্রসর হতে। এসবই ভাবছিলো সে এর মধ্যেই এক কথায় ক্লান্তি ছুটে যেয়ে আবার রাগ-ক্ষোভ ভর করে তার মন-মস্তিষ্কে।
বিথীর সামনের সিটেই বসে ছিলো আরিশা ও আশা। আরিশা বেশ খাণিক সময় বিথীকে পর্যবেক্ষণ করে বলে উঠলো, বিথী এটা তোর অনেক পুরনো শাড়ি না?
বিথী আরিশার প্রশ্ন মুখটা সামনে ঘুরিয়ে মাথা ঝুলিয়ে আরিশার কথার সম্মতি জানালো। আরিশার কথায় বিধানেরও ঘোর ভাঙলো।
আরিশাঃ এটা তো সেই শাড়িই যেটা তোর আঠারোতম জন্মদিনের দিন নীল ভাই তোকে উপহার স্বরূপ দিয়েছিলো। তোকে কতবার বলার পরও শাড়িটা পড়িসনি আজ কিন্তু তোকে বেশ মিষ্টি লাগছে শাড়িটাতে তাই না নীল ভাই?
নীলাভ্রও আরিশার কথায় বিথীর দিকে তাকালো আর মুচকি হেসে বলল, আসলেই তো এটা ঐ শাড়িটা বেশ সুন্দর লাগছে তোমায় যাক অবশেষে পড়ে শাড়িটাকে ধন্য করলা!
বিথীঃ হয়তো আপনার দেয়া শাড়ি ভাইয়া আসলে আমি খেয়াল করে পড়িনি দেখলাম শাড়িটার ভাজ ভাঙা নেই তাই ভাবলাম এই উপলক্ষে শাড়িটা পড়ে ফেলি।
এদিকে বিধান নীলাভ্রের দেয়া শাড়ি পড়েছে শুনে রাগে ফুসছে ফুসছে আর মনে মনে বলছে আমার দেয়া কিছুই এই আমিটাতে স্থান পায়নি পেয়েছে অন্যের অনুভূতি মিশে থাকা উপহার। তুমি কি জানো কাল অফিসের কাজ কত কষ্ট করে তাড়াতাড়ি শেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সারা মল খুঁজে সেই নীল ডিজাইনার শাড়িটা কিনে ছিলাম……কতটা উচ্ছ্বাসিত ছিলাম তোমাকে প্রথম বার আমার পছন্দের কিছু পরিহিতা দেখবো বলে। অথচ তুমি…….(বলেই একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আবার বলতে শুরু করলো)
এই শাড়িটা তো দূরে থাক আমার ভালোবাসার অনুভূতিতে মিশে থাকা সেই পেন্ডেন্টটাও গলায় রাখতে পারলে না। নাহ মিসেস চৌধুরী সব চুপচাপ মেনে নেয়ার ছেলে আমি না……দরকার হলে বাধ্য করবো তোমাকে তোমার অনুভবে আমাকে রাখতে……আর আজকের শাস্তি তো পাবেই খালি সময় সুযোগের অপেক্ষা
বলেই আয়াশাকে জোড়ে আকরে ধরে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। অনেক সময় মানুষ এতোটাই আবেগগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে যে সামনে যাকে পায় তাকেই আকরে ধরে খানিকের আশ্রয় পাওয়ার জন্য। সামনে থাকা মানুষটা একটা ছোট বাচ্চা হোক কিংবা তার চেয়ে দুর্বল কেউ। সে যাই হোক বিধান আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো মনের দুনিয়ায় আবার বিথী নামক প্রেম ভ্রমরের বিচার বসালো আবার কখনও তাকে ভালোবাসার মিষ্টি মুহূর্তের ছায়াছবিগুলো আবার স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠলো। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারেনি। বিথী বিধানের দিকে তাকিয়ে দেখে সে ঘুমিয়ে গিয়েছে তবে শান্তিতে মাথাটা রাখতে পারছে না তাই বিথী বিধানের মাথাটা আলতো হাতে নিজের ঘাড়ে রেখে দিলো। তা দেখে আয়াশা পিচ্ছিটা কি বুঝলো আল্লাহ জানে সে খিলখিল করে হেসে উঠিলো। হয়তো ভালোবাসার প্রকাশ ছোট শিশুমনও বুঝে। আর বিথীও তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গাল টেনে দিলো।
এদিকে দিশা বেচারি প্রচণ্ড পরিমাণে বিরক্ত কারণ কাউকে চিনে না তাই কথা বলার কেউ পাচ্ছে না। তার পাশে বসে থাকা নীলাভ্র চুপচাপ গেমস খেলছে আর কানে এয়ারফোনস লাগানো হয়তো গান শুনছে। দিশা বারবার নীলাভ্রের দিকে তাকাচ্ছে আর মনে মনে বলছে, কেমন ছেলে পাশে একজন সুন্দরী মেয়ে বসে আছে কথা বলা তো দূরে থাক চোখ তুলে তাকাচ্ছেও না আমার দিকে। মনে হয় কেউ নাই তার আশেপাশে! নিরামিষ একটা! দেখিস তোর বউ একটা বাচাল আর ফাজিল টাইপের মাইয়া হবে…..দিশার সাথে ভাব দেখাস! (বলেই ভেঙচি কাটলো)
এভাবে প্রায় এক ঘন্টা চলল কিন্তু দিশার বিরক্তির অন্ত তো হলোই না বরং আরও বেড়ে গেলো তাই না পেরে বিধানকে ডাকাতে লাগলো। আর দিশার ডাকে প্রায় সবাই তার দিকে তাকালো।
দিশাঃ বিধু! বিধুউউউউ! শোন না!
বিধান সারাদিনের ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে ব্যস্ত তাই সে এই ডাক উপেক্ষা করে এবং মুখে একটু বিরক্ত হওয়ার ভঙ্গিমা করে আবার ঘুমিয়ে যায়। এদিকে বিধানকে এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে বিথী দিশাকে আটকায়।
থীবিঃ দিশা আপু বিধান তো ঘুমুচ্ছে! আমাকে বলেন……উনাকে ডাক দিয়েন না।
দিশা পুরোপুরি বিথীর ডাক উপেক্ষা করে বিধানকে ডাক দেয়। যা দেখে বাসের সবাই খুব অবাক হয়। তবে এবার বিধান হুড়মুড়িয়ে ঘুম থেকে ডেকে যেদিক থেকে আওয়াজ আসছে সেদিকে তাকায়। তাকিয়ে দেখে নীলাভ্রের পাশের সিটে বসা দিশা। নীলাভ্রের কিছুটে বেকে বসায় ও তার হাইট দিশার থেকে অনেক বেশি বসায় দিশাকে পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না শুধু মুখটাই দেখা যাচ্ছে।
বিধানঃ কি হয়েছে এভাবে ডাকছিস কেন? (আশ্চর্যকথা হয়ে)
দিশাঃ বিধু তুই আমার পাশে বস না আমার অনেক বোরিং লাগছে! (মন খারাপ করে)
দিশার এই কথাটা আশা ও আরিশার পছন্দ হল না তাই বিথীকে সিট জোড়ার মাঝের ফাকা জায়গা দিকে হাত ঢুকিয়ে খোঁচা দিলো।
বিথীঃ আহ! কি?
আশাঃ এদিকে আয় (ফিসফিস করে)
বিথী মাথাটা সামনের সিটের সাথে ঠেকিয়ে জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকালো আশা ও আরিশার দিকে।
শাআঃ শোন! আমার তোর এই ননদটাকে সুবিধার লাগছে না। কেমন গায়ে পড়া টাইপ……যতই ভাইবোন হোক আপন তো না তাই এতো মেলামেশা ঠিক নাহ!
আরিশাঃ হ্যাঁ কেমন নির্লজ্জের মতো জিজুকে বলছে পাশে বসতে!
বিথীঃ তো আমি কি করবো।
আশাঃ তুই ওর বউ কি করবি মানে।
বিথীঃ হ্যাঁ বউ! ( তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে)
বিথীর কথা শুনে আশা ও আরিশা কিছু বলল না কারণ ওরা বুঝতে পারলো বিথী ও বিধানের মধ্যে কিছু তো হয়েছে। অবশ্য জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন করলো না কারণ তারা জানে বিথী কতটা চাপা স্বভাবের। লাখ জিজ্ঞেসবাদেও তারা কাঙ্ক্ষিত উত্তর পাবে না তাই জিজ্ঞেস করা নিছকই এক বোকামি।
অন্যদিকে বিধান দিশার কথায় মনে মনে ভাবছে, মাফ কর বোনু তোর এই কথা রাখা যাবে না। এমনেই আমার বউয়ের আমার দিকে নজর কম তার উপর ওই নীলাভ্রের সাথে আমি কিছুতেই তাকে বসতে তো দূরে থাক কথাও বলতে দিবো না।
দিশাঃ কি হলো বিধু!
বিধানঃ দিশু তুই কি বাচ্চা নাকি আমার সাথে বসবি! দুই দিন পর বিয়ে দিবো এমন বাচ্চামি করলে চলে?
দিশাঃ কিন্তু আমি তো….
আয়াশাঃ আলে বাবা বোল হত্তো তাই তো আমিও বোল হত্তি! তলো আমলা গল্প তোব্ব আত্তা!
দিশাঃ সত্যিইই!
বলে অত্যাধিক খুশি হয়ে নীলাভ্রের পা টুশটাশ করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আয়াশাকে কোলে তুলে নিয়ে জোড়ে একটা চুমু দিলো গালে। নীলাভ্র মনে মনে বলল, কি মেয়েরে বাবা! (মনে মনে)
বিধানের তো দিশাকে দেখে চক্ষু চড়কগাছে কারণ সে এতক্ষণে খেয়াল করলো দিশা তার বিথীর জন্য আনা শাড়িটা পড়ে আছে। এবার তার রাগ সে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না তাই শান্ত তবে রাগান্বিত স্বরে দিশাকে জিজ্ঞেস করলো, এই শাড়িটা কোথায় পেলি?
দিশা বিধানের এই নিরব রাগের সাথে পূর্ব পরিচিত তাই ভয়ে থরথর কাপতে লাগলো। বিথীও বিধানের কথায় প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে। তবে অন্য কারো কোনো ধ্যান নাই আর এদিকে কারণ বিধামের এই নিস্তব্ধ রাগের সাথে তারা অভ্যস্ত নয়।
দিশাঃ ভ-ভাবি দিয়েছে। ( বলেই আবার ঠাশঠুশ করে আয়াশাকে নিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়লো)
বিধান দিশার কথা শুনে পিছন ঘুরে এমনভাবে বিথীর দিকে তাকালো যে বিথীর কলিজা কেনো সারা শরীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার দশায়। তাই বিথী বিধানের দিকে অনেকটা কাঁদো কাঁদো হয়ে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, আ-আসলে আয়ায়ামি…….
বিধানঃ তুমি কি? (দাঁতে দাঁত চেপে)
বিথীঃ আ___আ___মি…….
বিধানঃ একদম চুপপপ! ( চোখ রাঙিয়ে)
বিথী বিধানের কথায় একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলো। বিধান বিথীর থেকে চোখ সরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো বাহিরে বেশ অন্ধকার এখন আর বাসের সবাই ক্লান্তিতে ও ঘুমে ঝিমুচ্ছে। তাই আয়ানকে ডাক দিয়ে বললো, আয়ান ভাইয়া! বাসের ড্রাইভারের ওদিকের লাইট বাদে বাকি লাইটগুলো অফ করে দিন। সবাই একটু রেস্ট নেক…….আর আলোটা চোখেও লাগছে।
আয়ানঃ হুমমম। ঠিকই বলেছো।
বিধানঃ ধন্যবাদ ভাইয়া।
লাইটগুলো অফ করতেই বাসে অন্ধকার ছেয়ে গেলো। বিধানদের দিকটায় অর্থাৎ পিছনের দিকটায় কিছুটা দেখা গেলেও তার পিছনে মানুষের অভাবে শূণ্য থাকা সিটগুলোতে একদম অন্ধকার বিরাজিত। বিধান সেদিকে তাকিয়েই একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বিথীকে আচমকা কোলে তুলে নিলো। বিথী কিছু বলতে নিবে তার আগেই বিধান বিথীর ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো আর ধীর পায়ে এগুলো একদম পিছনের সিটের দিকে।
বিথী ছটফট করায় বিধান তার একহাত দিয়ে বিথীর পেয়ে স্লাইড করতে লাগলো কারণ এতোদিনের সংসারে সে এটুকো জানে বিথী কি করলে একদম।স্তব্ধ হয়ে যায়। বিথীর ঠোঁট দুটো মুক্তি পেলো বিধান সিটে বসার পর। তবে ঠোঁট জোড়া ছাড়ার আগে জোরে একটা কামড় বসিয়ে দিলো নিচে ঠোঁটে ফলে রক্ত ও বিথীর চোখের পানি উভয়ই বেড়িয়ে আসলো।
জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় বিধান তা স্পষ্ট দেখলো তাই নিজের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে স্লাইড করে রক্ত মুছে দিলো আর ধির কণ্ঠে বলল,
জাস্ট বি কুয়াইট ডার্লিং এন্ড লেট মি ডু হোয়াট আই ওয়ান্ট। বিকজ ইটস দ্য টাইম ফর ইউর পানিশমেন্ট বেবি! (বলেই কাটা জায়গাটায় জোড়ে আঙুল চেপে ধরলো)
চলবে,,,,