জীবনের গল্প !! লেখাঃ আমিনুর রহমান

জীবনের গল্প 2

বিয়ের পর আমি আমার স্বামীর টাকায় পড়ালেখা করি এটা আমার শ্বশুর শাশুড়ি কখনোই চাইতেন না। কিন্তু আমার স্বামী আদনান আমাকে পড়ালেখা করায়। এটা আমার শাশুড়ি কেনো জানি মেনে নিতে পারেন না। সুযোগ পেলেই আমার পড়াশোনা নিয়ে কটু কথা শুনাবে আমাকে,সবার সামনে অপমান করবে। সে কেনো এমন করে সেটাও আমার অগোছালো মস্তিষ্কটা আঁচ করতে পারে না। আমি শুধু সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করি,প্রতি উত্তরে কোনো জবাব দেই না। কারণ আমার কথার পিঠে কথা বলা নিষেধ আছে। আদনান আমাকে এসব বিষয়ে সবসময় চুপ থাকতে বলেছে। আর যাইহোক না কেনো আমি যেনো তাঁর বাবা মাকে কখনো এমন কিছু না বলি যেটাতে তারা কষ্ট পেতে পারে। তাই আমি তাদের এতো অপমানজনক কথা শুনার পরেও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। আজও তাঁর ব্যতিক্রম হলো না।
বাড়ি ভর্তি মানুষ ছিলো তখন,আমি ভার্সিটি থেকে বাসায় এসেছি কেবল। আমাকে দেখেই আমার শাশুড়ি সবার সামনে আমাকে উদ্যেশ্য করে বলল,
“ওই যে আমাদের মডার্ন বউ চলে এসেছে। বিয়ের পরেও নাকি তাঁর পড়ালেখা করতে হবে, ক্লাসে না গেলে নাকি তাঁর পেটের ভাত হজম হয় না। নিজের চেহারাটা বাহিরের সবাইকে দেখাতে হবে। আমার ছেলে কি দেখে যে এই মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে এসেছিলো আমার মাথায় ধরে না।”
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিলাম। অনেক ইচ্ছে করছিলো কথাগুলোর জবাব দেই। কিন্তু আদনানের সেই কথাটা মনে পড়ায় কিছু বলতে পারলাম না। আমার শাশুড়ি আবারও যখন বলল,

“দুপুরে রান্না করবে কে? বাড়ির সবাই যে না খেয়ে আছে সেদিকে কি কারো খেয়াল আছে। আমরা তো কলেজে যাওয়ার জন্য কাউকে বউ করে আনিনি। রান্না বান্নাও তো করতে হবে। আদনান দুপুরে লাঞ্চ করতে এসে ফিরে গেছে। আমার ছেলেটার টাকাতেই তো ভাত কাপড় পাচ্ছো,পড়ালেখাও করছো। আমাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। তোমার স্বামীকেই না খাইয়ে রাখা শুরু করলে?”
আমার কথাগুলো সহ্য হলো না। মনে হলো ভিতরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। আমি আর আদনানের কথাটা মনে রাখলাম না। আমি প্রথমবারের মতো আমার শাশুড়ির মুখের ওপর বললাম।
“আপনি চাইলেই তো রান্না করে খাওয়াতে পারতেন আপনার ছেলেকে। এতোই যদি দরদ থাকতো তাহলে রান্না করে খাওয়াতেন। আপনার মেয়ের জামাই আসলে তো ঠিকই রান্না করে খুব যত্ন করে খাওয়ান। কতো রমকের খাবার রান্না করেন তাঁর হিসাব থাকে না। অথচ যে আপনাকে ভাত কাপড় দিচ্ছে,থাকতে দিচ্ছে তাঁর জন্য একটা দিন কষ্ট করে রান্না করতে পারলেন না। আবার আমাকে যা তা বলছেন। কই আপনার মেয়েরও তো বিয়ে হয়েছে,সেও তো পড়াশোনা করছে। তাকে নিয়ে তো কোনো আলোচনা করেন না। আমাকে নিয়ে আপনার এতো সমস্যা কেনো? আমি আপনার মেয়ে না,আপনার ছেলের বউ এটাই তো কারণ,না? নিজের মেয়ে হলে কি এমনভাবে বলতে পারতেন?”
পরক্ষণেই নিজের গালে থাপ্পড়ের শব্দ শুনতে পেলাম।
“বেয়াদব মেয়ে। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় বাবা মা বুঝি কখনো শেখায়নি? আমার মুখের ওপর কথা বলে,আদনান আসুক তারপর তোমার বিচার করবো। এখন যাও রান্না করে ঢুকে আমাদের সবাইকে উদ্ধার করো।”
সবার সামনে যখন আমার শাশুড়ি আমার গালে থাপ্পড় মেরে কথাগুলো বলল তখন নিজের অজান্তেই চোখের কোণে একফোঁটা জল অনুভব করলাম।
রান্না ঘরে বসে রান্না করছি আর ভাবছি। বিয়ের আগের দিন গুলো কতো সুন্দর ছিলো,কতো মুগ্ধতা ছিলো দিন গুলোতে। আদনান আমার জন্য কতো কি করেছে। বিয়ের আগে সে আমাক কথা দিয়েছিলো বিয়ের পর আমার পড়ালেখার কোনো সমস্যা হবে না। তাঁর কথায় পড়ালেখা শেষ হওয়ার আগেই বিয়ের পিরিতে বসেছিলাম। সে তাঁর কথা রাখলেও এখন কেনো জানি আমার এই সংসার জীবনটাকে অসহ্য মনে হয়। সকালে রান্না করে ক্লাসে যাওয়া,ক্লাস শেষ করে এসে আবার রান্না করা। এখন মনে হয় মেয়েদের জন্মই হয়েছে বোধয় রান্না ঘরের চুলা খোঁচানোর জন্য। তাদের লেখাপড়া শেষ করে বড় কোনো কিছু করার অধিকার নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি আমার শ্বশুর শাশুড়ির মন জয় করতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছি তাদের মনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য কিন্তু পারিনি। হয়তো বা আগে থেকেই তারা আমাকে পছন্দ করতেন না। তাই তাদের প্রতি আমার ভালোবাসাটাকে তারা গ্রহণ করতে পারে না। এর অবশ্য কারণও আছে। আদনানের অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক করেছিলো তারা। কিন্তু সে তাঁর বাবা মায়ের ঠিক করা মেয়েটাকে বিয়ে না করে আমাকে বিয়ে করেছে। তাদের ধারণা আদনানকে আমি আমার রুপের জালে ফাসিয়ে বিয়ে করেছি।
রাতে যখন আদনান আমাকে বলল,

“দুপুরে কাজটা তুমি একদম ঠিক করোনি। বড়দের সাথে এভাবে কথা বলা তোমার উচিত হয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা তারা আমার বাবা মা,আমার জন্মদাতা। বাবা মায়ের অপমান কোন ছেলেই সহ্য করবে না। আমিও করবো না।”
তখন আমি বললাম,
“তুমি আমার কথাটা শোনো আগে,কি হয়েছিলো। তারপর না হয় যা বলার বলবে। তোমার মা আমাকে সবার সামনে যা তা বলছিলো। আমার সহ্য হয়নি। আর আমি ভুল কিছু বলিনি।”
তখন আদনান ধমকের শুরু বলল,
“বাহ্ আমার মুখের ওপরও কথা বলছো দেখছি। আমি মায়ের কাছ থেকে সব শুনেছি। তোমার কাছ থেকে আবার শুনতে হবে না। একটা কথা মনে রাখবে আমার বাবা মায়ের ওপরে কেউ নেই। তুমি এখনি মায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে।”
বিয়ের পর এই প্রথম আদনান আমার সাথে এভাবে রাগান্বিত হয়ে ধমকের সুরে কথা বলল। আমি তাঁর এমন ব্যবহার দেখে অবাক হলাম। আমিও কিছুটা রাগান্বিত কণ্ঠে বললাম।
“তোমার মা তোমাকে তো সবকিছুই বলেছে। তাহলে তো এটাও বলছে আমার গায়ে সে হাত তুলেছে।”
তখন আদনান বলল,
“তারা বড় মানুষ। ছোটরা ভুল করলে তো শাসন করবেই। তুমি এখন মায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসো। আমি মাকে বলেছি তুমি ক্ষমা চাইবে।”
তখন আমি আদনানকে বললাম।
“আমি কোনো ভুল করিনি,তাহলে কেনো ক্ষমা চাইবো? আমি পারবো না এটা করতে। তোমার মা বাবা আমাকে দেখতে পারে না। বিয়ের পর থেকেই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। তোমাকে কখনো বলিনি। কিন্তু আজ না বলে পারলাম না। তুমি নিজের বাবা মায়ের খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের বউকে ভুলে গিয়েছো। সবসময় শুধু আমার দোষ খুঁজে বেড়াও তুমি। কখনো কি জানতে চেয়েছো তোমার বাবা মা আমার সাথে কেমন ব্যবহার করে? শুধু কি বউ শাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে? শাশুড়ি বউয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে না?”
আমার কথাগুলো শুনে আদনান কিছু বলল না। তবে আমি বুঝতে পারলাম আমার কথাগুলো তাঁর ভালো লাগেনি। সত্য কথা তেতো হয় তাই কারো ভালো লাগে না সেটা আজ বুঝলাম। কিছু সময় চুপ থেকে আদনান বলল,
“তার মানে তুমি মায়ের কাছে ক্ষমা চাইবে না?”
আমি সোজাসুজি বললাম,

“না কখনোই না। কোনো ভুল না করে কারো কাছে ক্ষমা চাইতে পারবো না আমি।”
প্রতি উত্তরে আদনান যে কথাটা বলল সেটার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি কখনো ভাবিওনি তাঁর মুখ থেকে এমন কিছু শুনতে হবে আমাকে। সে যখন বলল,
“ঠিক আছে। তোমার সব কথা আমি মেনে নিলাম। যেহেতু মায়ের কাছে ক্ষমা চাইলে তুমি ছোট হয়ে যাবে সেহেতু তোমাকে ক্ষমা চাইতে হবে না। কাল থেকে তুমি আর ভার্সিটি যাবে না। তোমার পড়ালেখা পুরোপুরি বন্ধ। আশা করি আমার এই কথাটা অন্তত রাখবে। আর না রেখে কোনো উপায়ও নেই তোমার।”
আদনানের কথাগুলো শুনে আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না কথাগুলো সেই বলছে। কিন্তু বিশ্বাস করতে হবে। কারণ এটা বাস্তব। সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছে। আমি কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে বললাম,
“কি বলছো তুমি পাগল হয়ে গেছো নাকি? আমার ফাইনাল ইয়ার চলে এখন। কিছুদিন পর আমার অনার্স শেষ হবে। আর তুমি বলছো পড়ালেখা বন্ধ করতে। তুমি একজন শিক্ষিত ছেলে হয়ে এই কথা কিভাবে বলতে পারলে?”
তখন আদনান বলল,
“আমি অনেক ভেবে চিন্তেই বলেছি। আমি চাই না তোমার পড়ালেখার কারণে আমাদের সংসারে কোনো অশান্তি সৃষ্টি হোক। যেহেতু আমার বাবা মা চায় না তাদের ছেলের বউ পড়ালেখা করুক,তারা চায় সংসারী হোক। তাই তুমি কাল থেকে আর ভার্সিটি যাবে না। ঘরের কাজেই মনোযোগ দিবে। আর পড়ালেখা করে কি করবে? এমন নাতো যে চাকরি করবে। আমি তো তোমার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছি। যতোদিন বেঁচে থাকবো ততোদিন তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। তাই সংসারের শান্তির জন্য হলেও তুমি কাল থেকে আর ভার্সিটি যাবে না।”
আমি অনেকটা অভিমান করে বললাম,
“যদি ভার্সিটি যাই তাহলে কি করবে?”
তখন আদনান বলল,
“আমি তোমাকে ছেড়ে দিতে বাঁধ্য হবো।”
চলবে…………